Close

সৌদির চিঠি: বিচিত্র শহর রিয়াধ (পর্ব ১৩)

ভালোবেসে ফেলেছি রিয়াধ শহরকে। সত্যিই বিচিত্র এই শহর। সৌদিও আর আগের মতো নেই। ধর্মীয় কট্টরপন্থাও বিলীন হচ্ছে আসতে আসতে।

সৌদির সবচেয়ে উঁচু স্কাইস্ক্র্যাপার কিংডম টাওয়ার-এর ৯৯ তলার স্কাইব্রিজ থেকে রিয়াধ শহর।

সৌদির চিঠি: এলাম মরুর দেশে; রিয়াধ যাওয়ার অভিজ্ঞতা (পর্ব ১২)

রিয়াধ সত্যিই এক বিচিত্র শহর। অতি অল্প সময়েই শহরটাকে ভালোবাসতে শিখে ফেলছি যেন। সমগ্র রাজধানী জুড়েই যেন ছাপ পাওয়া যাচ্ছে যে এই দেশ কোনদিকে এগিয়ে চলতে চাইছে। রিয়াধ শহরে ঘুরতে বেরোলে, বিশেষ করে নৈশ ভ্রমনে, সত্যিই মাঝে মধ্যে তাক লাগিয়ে দেবে! এই সৌভাগ্য আমার হয়েছিল যখন এখানকার প্রধান কিছু আকর্ষণীয় স্থান ঘুরতে বেড়িয়ে ছিলাম। সৌদির সবচেয়ে উঁচু স্কাইস্ক্রেপার কিঙডম টাওয়ারের ৯৯তলার চূড়ায় স্কাই ব্রিজ থেকে রিয়াধ শহর দর্শন থেকে শুরু করে, রিয়াধ বউলিভারডের ঝকঝকে কার্নিভাল, সৌদি আরবে আমায় বাধ্য করছে নতুন ভাবে আরব্য রজনীর অংশ হতে! সৌদি রাজতন্ত্রের নতুন এবং প্রধান উদ্দেশ্য এখন “ভিশন ২০৩০”। এর অন্তর্ভুক্ত শত শত ছোট বড় উন্নয়নকারী প্রকল্প এবং প্রোজেক্ট আছে। নিয়ম(NEOM) সিটি, দ্য লাইন, রিয়াধের মুকাব, জেড্ডাহ টাওয়ার, এরম নানা প্রকান্ড আকারের প্রকল্প এখনকার যুবরাজ এবং রাজার দুরদর্শিতার পরিচয় দেয়।

পৃথিবীর সবাই এখন মোটামুটি আন্দাজ করতে পারছেন যে সৌদি আরব আর আগের মতো নেই এবং তেলের জন্য তাদের একচেটিয়া দাপটেরও সীমায় পৌঁছে গেছে। কারুর জানতে বাকি নেই যে তেল একসময়ে ফুরিয়ে আসবেই, তাই তার আগেই সৌদি কে কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হবে বিশ্বে অর্থনৈতিকভাবে নিজের সুনাম টিকিয়ে রাখার জন্য। সেই কারনে, তেল ছাড়া বাকি সমস্ত কিছুতেই যেন তাদের বিনিয়োগ ব্যবসা চলছে। বিশেষ করে পর্যটনকেন্দ্রে খুব আগ্রহী ভাবে নজর দেওয়া হচ্ছে। আমাদের একজন ম্যানেজার ভীষণ উৎসাহের সাথে আমাদের কাছে বলছিলেন যে রিয়াধে নাকি গত কয়েক বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বিদেশী বিনিয়োগ হয়েছে! মিডল ইস্ট নাকি এখন নতুন ইউরোপ, এই কারণে এই জায়গাই এখন সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান আমাদের ক্যারিয়ারের জন্য।
একথা ঠিক যে সমগ্র পৃথিবীতে যা আর্থিক মন্দা চলছে এই মুহূর্তে, সেই হিসেবে দেখতে গেলে গাল্ফের দেশ গুলো অনেকটাই সুবিধায় আছে। অথবা বলাই যায় যে এই গাল্ফই এখন একমাত্র নিজেদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ধরে রাখতে পেরেছে। এটা আমরা সরাসরি ভাবে বুঝতে পেরেছিলাম যখন রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থা সেই কারনে এক ধাক্কা খেলেও সৌদি আরব যেন অটুট হয়ে দাঁড়িয়েছিল! রাশিয়ার ওপর ব্যবসায়ী স্যাঙ্কশন বসানোর কারনে সৌদি নিজেদের “পেট্রোডলার” এর জোরে যেন আরও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে গেল। হাতেনাতে এর ফল পেলাম যখন দেখলাম কিভাবে সৌদি রিয়ালের দাম বিশ্বের মুদ্রা বাজারে তরতর করে বেড়ে গেল – আমরা সৌদিতে এলাম এক রিয়ালে ১৯.৫০ ভারতিয় মুদ্রার রেট দেখে, যা রাশিয়ার তথাকথিত আগ্রাসনের সাথে সাথেই পৌঁছে গেল একেবারে ২২টাকার ওপরে! এটা আমি বলছি ৩-৪ মাসের ব্যবধানে, ২০২২ সালের শুরুর দিকে। অবশ্য সেই সময় এই অবাক করে দেওয়া অগ্রগতি ভারতের কিছু আর্থিক ঘাটতির কারনেও হয়েছিল বলা যায়, যার ফলে আগামী কিছু মাসের মধ্যেই আমাদের দেশের অর্থনৈতিক ভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর ফলে সেই সৌদি রিয়ালের দাম আবার একটু নেমে গিয়ে ২১ টাকায় এসে ঠেকেছিল। কিন্তু সেই কয়েকটা মাস আমাদের ঢের শিক্ষা দিয়ে দিয়েছিল যে আর্থিক ভাবে আমরা আমাদের এই চাকরিটা নিয়ে কতটা সুরক্ষিত আছি।

হয়তো মনে হবে যে আমরা এই ধরনের সুবিধা, অর্থাৎ যুদ্ধকালীন সময়ে বাকি পৃথিবীর মতো দুরবস্থায় না থাকার সুবিধা আমরা দখল করছি সৌদির খনিজ তেলের দয়ায়। কিন্তু আগে যেমন বললাম এই তেলের পরিবর্তে নতুন অর্থ উৎপাদনের উপায় খুঁজে বার করার জন্য এখানে সবাই উঠে পড়ে লেগেছে, সেই নিয়েই বলতে চাই আজ। আমি যেন ইতিহাসের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি, এই ধরনের নব্য অর্থ ব্যবস্থার কারনে রীতিমত এক সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রধান সাক্ষী হিসেবে! “ভিশন ২০৩০” যে শুধুমাত্র ব্যবসা এবং বিনিয়োগ ক্ষেত্রের চিন্তা নয়, বরং পরোক্ষ ভাবে এক আগাগোড়া সামগ্রীক ও সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে আসতে চলেছে, তা যেকোনো শুভবুদ্ধি সম্পন্ন ব্যাক্তি বলতে পারবে। সোজা কথায় বলতে গেলে, বিশ্বের দরবারে সৌদি যেন নিজের ভাঁড়ার খুলে দিয়ে দুহাত খুলে স্বাগত জানাচ্ছে। ৪-৫ বছর আগেও এখানে অনেক রকম বিষয় যা আমরা কল্পনা করতে পারতাম না, তা এখন চোখের সামনে পরিবর্তন হতে দেখছি। এক ক্যাফে তে আপাদমস্তক সাদা-কালো জোব্বা-বোরখার টেবিলের পাশাপাশি টিশার্ট জিন্স এ সজ্জিত এক রঙিন টেবিল থেকে সবরকম লিঙ্গের জোরে জোরে হাসাহাসি শুনতে পাই এখন। নামাজে না যাওয়ার জন্য এখন “মরাল পুলিশ” আর রাস্তায় দাঁড় করিয়ে জরিমানা করায় না। এই বছর পরিক্ষার হলে আবায়া, অর্থাৎ মহিলাদের লম্বা গাউনের মতো পোশাক যেটা, তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কালো আবায়া পরনে রেখে ঝলমলে রামধনু রঙের চুল খুলে হাসি মুখে পথে বেরোতে পারছে আমার বয়সী মেয়েরা! নিজের গাড়িতে ফুল ভলিউমে আধুনিক আরবি গান চালিয়ে আনন্দ করতে বেরোচ্ছে মানুষ!

কিন্তু এত কিছু হওয়া সত্ত্বেও, জনসাধারণের, এবং বিশেষ করে মহিলাদের সুরক্ষার এতটুকু এদিক ওদিক হয়নি। জেড্ডাহর কার্নিভ্যাল দেখে আমি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম, যখন দেখছি নাগরদোলার একই লাইনে একদিকে শর্টস পরা এক পুরুষের দল নিজেদের কাঁধে হাত রেখে উল্লসিত হয়ে রক গানে তালে তাল মিলিয়ে নাচছে, আর তারই পাশে বোরখায় আচ্ছাদিত নারীরাও সেই সঙ্গীতে “ভাইব” করছে, আবার তারই পাশে “পশ্চিমা পরন” এ মেয়েরা হাসাহাসি করছে। ছোটবেলা থেকে সৌদি নিয়ে যে ধরনের গল্প শুনে যা সব ধারনা তৈরি হয়েছিল, সমস্ত যেন ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে আমার মনে। আবার এসবের সাথে সাথেই, রিয়াধে গত বছর যখন “রেভ পার্টি কনসার্ট” হলো, তখন নামাজের সময়ে চারদিক একেবারে শান্ত করে দিয়ে সবার নামাজ পড়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হলো। সবরকম মাদকদ্রব্য ছাড়া রেভ পার্টি চলছে, আবার নিয়মানুযায়ী সময়মত নামাজ পড়া হচ্ছে। এই ধরনের সুশৃঙ্খলতা মেনে রীতিমত বৈপ্লবিক পরিবর্তন দেখলে সত্যিই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠবে, ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার আনন্দে।

এইসব নিয়ে যখন এখনও কিছু প্রবাসী কট্টর ইসলামী পাকিস্তানিদের অভিমান যেন বিশেষ ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সৌদি আরবের কট্টরপন্থী ভাব মুছে যাওয়ার জন্য অনেক বাংলাদেশি, পাকিস্তানি মুসলমানের ক্ষোভ প্রায়ই উগরে আসে। একবার এরকম এক পাকিস্তানি ট্যাক্সি চালক যিনি প্রায় ৩ দশক ধরে সৌদি তে আছেন,তিনি আমাদের তার গাড়িতে গান চালাতে নিষেধ করে সৌদির এই ধরনের পরিবর্তন গুলো নিয়ে চূড়ান্ত ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করলেন, তখন আমার যেন শুধু একটাই লাইন জোর গলায় ওনাকে শোনাতে ইচ্ছে করলো – “এলেম নতুন দেশে”!

সৌদির চিঠি: বিদেশে বাঙালি ডেলিভারি বয়দের গল্প(পর্ব ১৪)

লেখক

Leave a comment
scroll to top