Close

World Chess Championship 2023: নেপোমনিয়াশি-ডিং দ্বন্দ্ব, পরপর তিনটি নির্ণায়ক গেম

বিশ্বখেতাবী লড়াইয়ের অর্ধেক পথ পেরিয়েছেন দুই প্রতিদ্বন্দ্বী। সাত রাউন্ডের খেলা শেষে ৪-৩ ব্যবধানে এগিয়ে আছেন ইয়ান নেপোমনিয়াশি।

Source: FIDE

বিশ্বখেতাবী লড়াইয়ের অর্ধেক পথ পেরিয়েছেন দুই প্রতিদ্বন্দ্বী। সাত রাউন্ডের খেলা শেষে ৪-৩ ব্যবধানে এগিয়ে আছেন ইয়ান নেপোমনিয়াশি। এবারের বিশ্বখেতাবী লড়াই আগের সবকটি বিশ্বখেতাবী লড়াইয়ের থেকে আলাদা। কারণ, ৭ রাউন্ডের মধ্যে ৫টি খেলায় জয়সূচক ফলাফল এসেছে। সাম্প্রতিক অতীতে এমন ফলাফল হয়নি। কারপভ বনাম করশনয়, কারপভ বনাম কাসপারভ, কাসপারভ বনান আনন্দ, আনন্দ বনাম ক্রামনিক, আনন্দ বনাম গেলফাঁ- প্রথম সাত রাউন্ডের পাঁচটিতে নির্ণায়ক ফলাফলের নজির নেই। একমাত্র ব্যতিক্রম ১৯৭২ সালে বরিস স্প্যাসকি বনাম ববি ফিশারের বিশ্বখেতাবী লড়াই। সেবারেও প্রথম সাতটির মধ্যে পাঁচটিতে জয়সূচক ফলাফল এসেছিল- ফিশার ৪-৩ এগিয়ে গেছিলেন। যদিও, দ্বিতীয় রাউন্ডে ফিশার খেলতেই বসেন নি, ওয়াকওভার পেয়ে জেতেন স্প্যাসকি। একুশ শতকে দাবা খেলার বহ নীতিকৌশল বদলেছে। প্রতিযোগিতার আঙ্গিকে বদল এসেছে। দাবা-ইঞ্জিনের যুগে দাবাড়ুদের প্রস্তুতির ধরন বদলেছে। শীর্ষস্তরের প্রতিযোগিতাগুলির অনেক ম্যাচ ড্র হয়। বিশ্বখেতাবী লড়াইয়ের সমানে-সমানে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শুরুর ম্যাচগুলিতে পরস্পরকে মেপে নেওয়া চলে। কার্লসেনের জেতা পাঁচটা বিশ্বকাপের মধ্যে একমাত্র ২০১৪ সালে বিশ্বনাথন আনন্দের বিরুদ্ধে ৩টি জয়সূচক ফলাফল এসেছিল প্রথম সাতটি রাউন্ডের মধ্যে। পরের বিশ্বকাপগুলোয় কার্লসেনের প্রতিপক্ষ ছিলেন কারিয়াকিন, কারুয়ানা, নেপোমনিয়াশি… কিন্তু সপ্তম রাউন্ড অবধি সবক’টি ম্যাচ হয় ড্র হয়েছিল নয়তো দু’টি নির্ণায়ক ফলাফল এসেছিল। ডিং লিরেন ও ইয়ান নেপোমনিয়াশির প্রতিদ্বন্দ্বিতা এদিক থেকে ব্যতিক্রমী।

পঞ্চম রাউন্ডের খেলা-
World Chess Championship 2023: ইয়ান নেপোমনিয়াশি বনাম ডিং লিরেন
1.e4 e5 2.Nf3 Nc6 3.Bb5 a6 4.Ba4 Nf6 5.O-O Be7 6.d3 b5 7.Bb3 d6 8.c3 O-O 9.h3 Bb7 10.a4 Na5 11.Ba2 c5 12.Bg5 h6 13.Bxf6 Bxf6 14.axb5 axb5 15.Nbd2 Nc6 16.Bd5 Rxa1 17.Qxa1 Qd7 18.Re1 Ra8 19.Qd1 Bd8 20.Nf1 Ne7 21.Bxb7 Qxb7 22.Ne3 Bb6 23.h4 Qc6 24.h5 c4 25.d4 exd4 26.Nxd4 Qc5 27.Qg4 Qe5 28.Nf3 Qe6 29.Nf5 Nxf5 30.exf5 Qf6 31.Qe4 Rb8 32.Re2 Bc5 33.g4 Qd8 34.Qd5 Kf8 35.Kf1 Rc8 36.Re4 Rb8 37.g5 hxg5 38.Rg4 Ra8 39.Nxg5 Ra1+ 40.Ke2 Qe7+ 41.Ne4 Qe8 42.Kf3 Qa8 43.Qxa8+ Rxa8 44.f6 g6 45.hxg6 fxg6 46.Rxg6 Ra2 47.Kg4 Rxb2 48.Rh6 1-0


এই প্রতিযোগিতার ধারাভাষ্যকারদের মধ্যে অনীশ গিরি ম্যাচ বিশ্লেষণ থেকে সময়োপযোগী মন্তব্য সবেতেই প্রখর মেধার ছাপ রাখছেন। পঞ্চম গেমে ডিংয়ের খেলায় বিরক্ত অনীশ বলেই ফেললেন, “Ding got outplayed today. He made a lot of mistakes.” দাবাড়ুদের প্রস্তুতির একটা বড় ধাপ হচ্ছে, কোনও নির্দিষ্ট ওপেনিং শাখায় যে যে গুরুত্বপূর্ণ গেম খেলা হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করা। মনে রাখা। প্রতিটি শাখা, উপশাখা, সম্ভাব্যশাখা সমেত মনে রাখা। নেপোমনিয়াশি ও ডিং রুই লোপেজ ওপেনিং শাখায় যে গেমটি খেলেছেন, হুবহু (২২দান অবধি) এক দানপর্যায় গতবছর আলিরেজা ফিরুজা বনাম অনীশ গিরির গেমে হয়েছিল। ফিরুজা দশম দানে a4-এর মতো বিরলতম দান দিয়েছিলেন। নেপোমনিয়াশি তা মনে রেখেছেন। যথাযথ প্রস্তুতি নিয়েছেন। তাই দ্রুত ওপেনিং ও মিডলগেমের তাৎপর্যপূর্ণ দানগুলি খেলে ফেলেছেন। ডিংয়ের সেই প্রস্তুতিতে ঘাটতি ছিল। তিনি ঠিক দানপর্যায় অনুসরণ করেছেন, কিন্তু ভাবার জন্য সময় চলে গেছে অনেকটা। ডিং প্রথম হোঁচট খেলেন ২৯ নম্বর দানে। Nxf5 মারলেন। তাঁর পজিশনে দুর্বলতা তৈরি হল। নেপোর নিয়ন্ত্রণে থাকা রাজার দিকের পনগুলি বাড়িয়ে ডিংয়ের রাজার দুর্গ ভাঙার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন নেপোমনিয়াশি। আর, তারপরেই পজিশন বিচার করতে ভুল করলেন ডিং। সাদার g5 দানের জবাব খুঁজে না-পেয়ে পনটিকে খেয়ে নিলেন। নেপোমনিয়াশি এরপরে ডিংয়ের ব্যূহ ভেঙ্গেচুরে জিততে বেশি সময় নেননি।


এই বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে আরও একটা আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে। কোনও গেম ৪ ঘণ্টার বেশি হচ্ছে না। গত বিশ্বকাপে প্রথম নির্ণায়ক গেম হয়েছিল ষষ্ঠ রাউন্ডে। কার্লসেন আর নেপোমনিয়াশি বিশ্বকাপের ইতিহাসে দীর্ঘতম ম্যাচ খেলেছিলেন। প্রায় ৮ ঘণ্টা লড়াই ক’রে ১৩৬ চালে জিতেছিলেন কার্লসেন। আর, পরের ম্যাচগুলোয় নেপোমনিয়াশিকে প্রত্যাঘাতের সুযোগ দেননি। ওই গেমের শারীরিক ও মানসিক ধকল স্নায়ু দুর্বল ক’রে দিয়েছিল নেপোমনিয়াশির। কিন্তু, এই বিশ্বকাপে কোনও গেমই দীর্ঘতর লড়াইয়ের সাক্ষ্যবাহী না। সর্বাধিক ৪৯ দান খেলা হয়েছিল তৃতীয় গেমে।
তাহলে কি ডিং আর নেপোর মনঃসংযোগের অভাব ঘটছে? নাকি পূর্বপ্রস্তুতি ভুলে গিয়ে খেলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন? স্নায়ুদৌর্বল্যও একটা কারণ হতে পারে। যে শারীরিক ও মানসিক দক্ষতা থাকলে প্রায় ৮ ঘণ্টা টানা প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে লড়া যায়, সেই দক্ষতার ঘাটতি হচ্ছে কি? ধৈর্য রেখে ব্যূহ তৈরি করা এবং দুর্গ সামলানোয় ভুল হয়ে যাচ্ছে… আনন্দ, অনিশ গিরি, জুডিথ পোলগারের মতো ধারাভাষ্যকাররা চমকে উঠছেন ভুলের বহর দেখে। ষষ্ঠ গেমে বলেছেন, “it’s a horrible position for Black [Nepomniachtchi]” ডিং এই গেমে লন্ডন সিস্টেম পদ্ধতি বেছে নিয়েছিলেন।


ষষ্ঠ গেম-
World Chess Championship 2023: ডিং লিরেন বনাম ইয়ান নেপোমনিয়াশি
1.d4 Nf6 2.Nf3 d5 3.Bf4 c5 4.e3 Nc6 5.Nbd2 cxd4 6.exd4 Bf5 7.c3 e6 8.Bb5 Bd6 9.Bxd6 Qxd6 10.O-O O-O 11.Re1 h6 12.Ne5 Ne7 13.a4 a6 14.Bf1 Nd7 15.Nxd7 Qxd7 16.a5 Qc7 17.Qf3 Rfc8 18.Ra3 Bg6 19.Nb3 Nc6 20.Qg3 Qe7 21.h4 Re8 22.Nc5 e5 23.Rb3 Nxa5 24.Rxe5 Qf6 25.Ra3 Nc4 26.Bxc4 dxc4 27.h5 Bc2 28.Nxb7 Qb6 29.Nd6 Rxe5 30.Qxe5 Qxb2 31.Ra5 Kh7 32.Rc5 Qc1+ 33.Kh2 f6 34.Qg3 a5 35.Nxc4 a4 36.Ne3 Bb1 37.Rc7 Rg8 38.Nd5 Kh8 39.Ra7 a3 40.Ne7 Rf8 41.d5 a2 42.Qc7 Kh7 43.Ng6 Rg8 44.Qf7 1-0


এই গেমে ডিং ফিরে এলেন। আগের ম্যাচে নেপোমনিয়াশির কাছে পর্যুদস্ত হওয়ার জ্বালা ভুলে মধুর প্রতিশোধ নিলেন। খেলায় হেরে যাওয়া বড় কথা নয়। হেরে যাওয়ার পরে ফিরে আসতে পারে যে, সেই প্রকৃত খেলোয়াড়। সেটাই ক্রীড়াবিদের মানসিকতা। ডিং লন্ডন সিস্টেম খেললেন, কিন্তু বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপের গেমে লন্ডন সিস্টেম খেলতে পছন্দ করেন না দাবাড়ুরা। ১৯৪৮ সালের বিশ্বখেতাবী লড়াইয়ে সোভিয়েতের মিখাইল বটভিনিক স্বদেশীয় দাবাড়ু পল কেরেসের বিরুদ্ধে লন্ডন সিস্টেম খেলেছিলেন। তারপরে ডিং খেললেন। তবে, নেপোমনিয়াশি ওপেনিং যথাযথ খেললেও, ডিং ক্রমশঃ নিজের স্বস্তিক্ষেত্রে ঢুকে পড়ছিলেন। এমন ব্যূহ সাজাছহিলেন, যেখানে তাঁর পক্ষে গেমের নিয়ন্ত্রা হয়ে ওঠা সহজ। ১৮ নম্বর দানটি আপাতদৃষ্টিতে নিষ্প্রভ এবং উদ্দেশ্যহীন দান। কিন্তু, গেম যত এগিয়েছে, দানটির গুরুত্ব তত বোঝা গেছে। Ra3 দানটিকে ডিং বলেছেন, ‘a useful waiting move’। দাবায় ওয়েটিং মুভ-এর তাৎপর্য এই যে, কয়েক দান পরে গিয়ে এই ধৈর্যশীল দানটি নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে। ২৯ নম্বর দানে ডিং Nd6 খেললেন। দানটি শুধু চমকপ্রদ না, বরং সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যের জন্য উদগ্রীব। দাবা-শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষণীয় কুইন+রুক+নাইট সক্রিয় ক’রে কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্কোয়ারগুলির দখল নেওয়া যায়।

ডিং যে চেকমেটের জাল বিস্তার করলেন, তা এই বিশ্বকাপে এখনও অবধি সেরা কম্বিনেশন। ৪১ নম্বর দানে ডিং একটি আশ্চর্য দান দিয়েছিলেন। d5!? দানটির তাৎপর্য বোঝা গেল তিনটি দান পরে গিয়ে। কারণ, নেপোমনিয়াশিকে ততক্ষণে চেকমেটের জালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছেন ডিং। সাদার Qf7 দানের পরে কালোর পক্ষে বাঁচা অসম্ভব। এরপর ডিং কুইন বলিদান দেবেন (Qxg7) এবং নাইট ও রুকের যোগসাজশে চেকমেট করবেন। সাদার d5 পনটি কালো রাজার পালাবার পথ আটকে আটকে দিচ্ছে.


দাবায় ম্যাগনাস কার্লসেন স্বতন্ত্র যুগের সূচনা করেছেন। দাবাকেন্দ্রিক গবেষণা, প্রযুক্তির সহায়তা, নিত্যনতুন উদ্ভাবন এবং খেলার আঙ্গিকে বিভিন্ন অদলবদল গত দেড় দশকের দাবার খোলনলচে বদলে দিয়েছে। এই যুগের দাবায় কেন ম্যাগনাস কার্লসেন দাবাড়ুর দাবাড়ু, তথা সেরার সেরা, বারবার প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ ক’রে স্বেচ্ছায় তিনি বিশ্বখেতাব ছেড়ে দেওয়ার পরে। আর, এর ফলে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, নেপোমনিয়াশি বা ডিং কেউই সেটা পূরণ করতে পারছে না। ডিং বিশ্বের অন্যতম সেরা। নেপোমনিয়াশিও তাই। দু’বার বিশ্বখেতাবী লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা তাঁর। দাবা-ইঞ্জিনের মতো প্রায়-নিখুঁত দানপর্যায় ভাবা, স্মৃতিশক্তি, দুর্দান্ত দান খুঁজে বের করা, প্রতিরক্ষাকৌশল- সবকিছুই তাঁদের আয়ত্ত্বে। তবু, এটা মনে রাখা প্রয়োজন যে, প্রায়-নিখুঁত দান দেওয়া, একটা-দু’টো ব্রিলিয়ান্ট মুভ দেওয়া কিংবা একটা নভেলটি দেওয়া শুধুমাত্র দাবা না। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের প্রতিটি ম্যাচ আরও অনেক বেশি কিছুর প্রত্যাশা করে। আরও বহু দক্ষতার প্রয়োজন হয়। ধৈর্য, স্নায়ু, উদ্ভাবনী কৌশল, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, ইস্পাতকঠিন মানসিকতা… ম্যাগনাস কার্লসেন শুধু নিজেই দুর্দান্ত খেলতেন না, প্রতিপক্ষকে বাধ্য করতেন তার সেরা খেলাটা খেলতে। ধ্রুপদী আঙ্গিকের অধিকাংশ খেলা অমীমাংসিত থাকত। কিন্তু, নভেলটি থেকে প্রতিরক্ষা থেকে উদ্ভাবনী দানে চকিত আক্রমণ সবই তাতে থাকত। ব্যাকরণ ভাঙার সাহস আর ইস্পাতকঠিন মানসিকতায় পজিশন অবিকৃত রাখার জেদ আর প্রতিপক্ষকে ধীরে ধীরে পিষে দেওয়ার খুনে-আকাঙ্খা খেলাগুলিকে অন্য মাত্রা দিত। এই বিশ্বখেতাবী লড়াইয়ে সেটা যেন উবে গেছে।


সপ্তম গেমে নেপোমনিয়াশি জিতলেন। প্রায় ড্র গেম। পজিশন সমান সমান। কিন্তু, টাইমপ্রেসারে মারাত্মক ভুল করলেন ডিং। দাঁড়িপাল্লার কাঁটা ঝুলে গেল নেপোমনিয়াশির দিকে।


World Chess Championship 2023: ইয়ান নেপোমনিয়াশি বনাম ডিং লিরেন
1.e4 e6 2.d4 d5 3.Nd2 c5 4.Ngf3 cxd4 5.Nxd4 Nf6 6.exd5 Nxd5 7.N2f3 Be7 8.Bc4 Nc6 9.Nxc6 bxc6 10.O-O O-O 11.Qe2 Bb7 12.Bd3 Qc7 13.Qe4 Nf6 14.Qh4 c5 15.Bf4 Qb6 16.Ne5 Rad8 17.Rae1 g6 18.Bg5 Rd4 19.Qh3 Qc7 20.b3 Nh5 21.f4 Bd6 22.c3 Nxf4 23.Bxf4 Rxf4 24.Rxf4 Bxe5 25.Rh4 Rd8 26.Be4 Bxe4 27.Rhxe4 Rd5 28.Rh4 Qd6 29.Qe3 h5 30.g3 Bf6 31.Rc4 h4 32.gxh4 Rd2 33.Re2 Rd3 34.Qxc5 Rd1+ 35.Kg2 Qd3 36.Rf2 Kg7 37.Rcf4 Qxc3 1-0


ডিং এই খেলায় ফরাসী প্রতিরক্ষা নীতি বেছে নিয়েছিলেন। প্রায় ১০ বছর বাদে কোনও শীর্ষস্তরের প্রতিযোগিতায় ডিং এই ওপেনিংটি খেললেন। ব্যাকরণ মেনে ব্যূহ সাজালেন। নেপোমনিয়াশিও মাথা ঠাণ্ডা রেখে টারাশ শাখা বেছে নিয়ে পিস-পন সাজাতে লাগলেন বা খাওয়াখাওয়ি করতে লাগলেন। ২২ নম্বর দানে অত্যাশ্চর্য দান দিলেন ডিং। Nxf4! তার পরের দানে সিদ্ধান্ত নিলেন নিজের রুকের বদলে সাদার নাইট খাওয়ার (দাবার পরিভাষায় একে বলে এক্সচেঞ্জ স্যাক্রিফাইস)। ক্ষুরধার দাবাজ্ঞান না থাকলে এমন পজিশনাল স্যাক্রিফাইস করা যায় না। এই দানদু’টির ফলে এতক্ষণ সাদা মাঝছকের ওপরে যে বজ্রকঠিন নিয়ন্ত্রণ রেখেছিল, তা আলগা হল। এবং সাদার দ্বৈত-বিশপ জোড় ভেঙে দিয়ে কালোর দ্বৈত-বিশপ শক্তিশালী হয়ে উঠল।

গেম অমীমাংসিত থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে ধারভাষ্যকার থেকে দাবাবিদরা যখন নিশ্চিত, তখনই একটি অপ্রত্যাশিত চরম ভুল দান দিলেন ডিং। বিশ্বখেতাবী ম্যাচে এমন ভুল অকল্পনীয় এবং অক্ষমার্হ। ডিং লিরেন স্রেফ স্নায়ুদৌর্বল্যে হারলেন। ডিং দানমগ্ন হয়ে ভুলে গেছিলেন যে, সময় ফুরিয়ে আসছে। মাত্র ১ মিনিটে ৯টা দান দেওয়ার চাপ বিশ্বখেতাবী ম্যাচে সামলানো অসম্ভব। নেপোমনিয়াশির কৃতিত্ব এখানেই যে, ডিংকে ভাবতে বাধ্য ক’রে তাঁর সময় কেড়ে নিতে পেরেছেন। ডিং ৩২ নম্বর দানে যে Rd2 দিলেন, তা গেমের নির্ণায়ক হয়ে গেল। কারণ, সাদা এরপরে নিজের প্রতিরক্ষা সামলে কালোর পন খেয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়ে গেল। নেপোমনিয়াশি জেতার সুযোগ হাতছাড়া করেননি- সঠিকভাবে নিজের দ্বৈত-রুক দিয়ে কালোর দুর্গ ভাঙতে তৎপর হয়েছেন।


ডিং কি জানতেন না যে, Rd2 দানের বদলে Be5 দানটি অনেক বেশি কার্যকর? কালোর অবস্থানে সামঞ্জস্য রক্ষা করতে Be5 দিয়ে, তারপর Rd2 খেলে সাদার h2 পনের ওপরে তীব্র আক্রমণ করা যাবে- ডিং কি এই পরিকল্পনা করেননি? করেছিলেন। তাঁর মত দাবাড়ু এই সামান্য পরিকল্পনায় ভুল করবেন না। তবু, ওই যে, সময় ফুরিয়ে আসার অতিরিক্ত ভার চেপে বসল তাঁর চিন্তাসূত্রের ওপর! মোক্ষম সময়ে সামান্য একটা ভুল তাঁর সব অস্ত্র কেড়ে নিল। নেপোমনিয়াশি জয়ের মুহূর্ত উপভোগ করলেন। স্বস্তিও। প্রতিপক্ষকে টাইমপ্রেসারে ফেলে দিয়ে ভুল করতে বাধ্য করা গেমের একটি কৌশল। ইয়ান সেই কৌশল প্রয়োগ ক’রে শেষ আঘাত হানলেন সপ্তম রাউন্ডে। সাংবাদিক সম্মেলনে বললেন, “the whole game was extremely sharp and extremely tense.” গেমটি উত্তেজক নিঃসন্দেহে। চড়াই-উৎরাই পেরোতে পেরোতে আকর্ষক হয়ে উঠেছে। কিন্তু, সপ্তম গেম অবধি পৌঁছে কিছু বিষয় প্রতীয়মান হচ্ছে- লিরেন বা ইয়ান কেউই পজিশন ধরে রাখতে পারছেন না। অধৈর্য হয়ে পড়ছেন। অহেতুক চাপ নিয়ে স্নায়ুর লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ছেন।

এখনও পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম গেমের পরে আর একটাও গেমে এন্ডগেম পর্ব আসেনি। এন্ডগেমে পৌঁছে প্রতিপক্ষের সঙ্গে তত্ত্ব ও পরিকল্পনার প্রয়োগে সেয়ানে সেয়ানে টক্কর দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। মিডলগেমের শেষপর্যায়ে খেলার ফলাফল নির্ধারিত হয়ে গেছে। এখনও সাতটা রাউন্ড বাকি। ডিং লড়াইয়ে ফিরবেন এমন প্রত্যাশা করাই যায়। নেপোমনিয়াশি পয়েন্টের ব্যবধান বজায় রাখতে মরিয়া হয়ে উঠবেন নিশ্চয়ই। নেপোমনিয়াশি ও ডিং নিজেদের সেরা খেলা খেলে আরও উপভোগ্য ক’রে তুলবেন বাকি গেমগুলি, এমন আশা রাখাই যায়।

প্রবুদ্ধ ঘোষ, জাতীয় স্তরের দাবাড়ু ছিলেন, বর্তমানে বেঙ্গল চেস অ্যাসোশিয়েশনের আধিকারিক, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের গবেষক, কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক।

Leave a comment
scroll to top