Close

জাপানি কতৃপক্ষ ভারতীয় শ্রমিকদের আক্রমণ করছে, অভিযোগে লাগাতার আন্দোলনে ইউনিয়ন

জাপানি কতৃপক্ষ ভারতীয় শ্রমিকদের আক্রমণ করছে, ছাঁটাই করছে, জাতীয়তাবাদী বিজেপি সরকারের মদদে, এই অভিযোগ তুলে লাগাতার আন্দোলনে ইউনিয়ন।

জাপানি কতৃপক্ষ ভারতীয় শ্রমিকদের উপর নামিয়ে আনছে আক্রমণ, প্রতিরোধে ট্রেড ইউনিয়ন

বাকি কারখানায় জাপানি কতৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলনে সামিল শ্রমিকেরা

ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লীর অদূরে অবস্থিত হরিয়ানা রাজ্যের গুরুগ্রাম (পূর্বে গুরগাঁও) শহরে একটি জাপানি কোম্পানির কতৃপক্ষের বিরুদ্ধে ভারতীয় শ্রমিকদের বলপূর্বক ছাঁটাই করার অভিযোগ তুলে আন্দোলনে নামলো শ্রমিক ইউনিয়ন। বেলসোনিকা অটো কম্পোনেন্টস ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড (বাকি) নামক এই সংস্থার শ্রমিক ইউনিয়নের অভিযোগ যে জাপানি কতৃপক্ষ ভারতীয় শ্রমিকদের উপর ২০২১ সাল থেকে একের পর এক শাস্তির কোপ মারছে, এবং এই ভাবে কারখানার স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিক সংখ্যা কমিয়ে ২০২০ সালে পাশ হওয়া নয়া শ্রম কোড হিসাবে শুধু ঠিকা শ্রমিক দিয়ে কারখানা চালাতে চাইছে।

জাপানি কতৃপক্ষ ভারতীয় শ্রমিকদের ছাঁটাই-বিরোধী দাবি না মানায় ১লা মার্চ ২০২৩ থেকে লাগাতার আন্দোলনে নেমেছে ইউনিয়ন। এর ফলে ১৮ই এপ্রিল পিঠে পোস্টার বেঁধে কারখানায় কাজ করতে দেখা গেছে শ্রমিকদের। তাঁদের অভিযোগ জোর করে, তথ্য বিকৃত করে, এবং সরকারের সাহায্যে জাপানি মালিকপক্ষ কারখানায় কর্মরত ভারতীয় শ্রমিকদের চাকরি থেকে ছাঁটাই করে চলেছে তাই তাঁরা নানা পন্থায় বিরোধিতা করে চলেছেন।

২০০৬ সালে গুরুগ্রামে মারুতি সুজুকি কারখানার গাড়ির অংশ সরবাহ করার জন্যে জাপানের সুজুকি কোম্পানির সাথে চুক্তি করে বেলসোনিকা আটো কম্পোনেন্টস ইন্ডিয়া (বাকি) প্রাইভেট লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই কারখানায় ২০১৬ সালে শ্রমিক সংখ্যা ছিল ১,৩৭০ জন। বেলসোনিকা অটো কম্পোনেন্টস ইন্ডিয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মহিন্দার কাপুর ইস্ট পোস্ট বাংলা কে জানান যে বর্তমানে এই কারখানায় স্থায়ী শ্রমিক আছেন ৭০০ জন, ১২৬ জন অস্থায়ী শ্রমিক।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সরকার ২০২০ সালে সংসদে বিতর্কিত শ্রম কোড পাশ করানোর পর থেকে জাপানি কতৃপক্ষ ভারতীয় শ্রমিকদের বলপূর্বক ছাঁটাই করে সেই জায়গায় চুক্তি ভিত্তিক, অধিকারহীন শ্রমিক নিয়োগের পরিকল্পনা করে বলে কাপুর অভিযোগ করেন। ২০২১ সালে জাপানি কতৃপক্ষ ভারতীয় শ্রমিকদের জন্যে স্বেচ্ছা অবসরের পরিকল্পনা নিয়ে আসে। কিন্তু অধিকাংশ যুব শ্রমিক স্বেচ্ছা অবসর নিতে অস্বীকার করেন এবং তাঁরা জাপানি কতৃপক্ষের প্রস্তাব খারিজ করেন।

এর পরে, কাপুর অভিযোগ করেন, যে ভারতীয় শ্রমিকেরা স্বেচ্ছা অবসর নিতে অস্বীকার করায় জাপানি কতৃপক্ষ অভিযোগ করে যে অনেক শ্রমিকেরই নাকি কর্ম অভিজ্ঞতার ও শিক্ষাগত যোগ্যতার নথি জাল, এবং সেই জাল নথি পরীক্ষা করার নামে তারা নানা শ্রমিকের নামে অভিযোগ করে পুলিশে। কাপুর জানান ২০২১ সালেই ২২জন শ্রমিকের ——২১জন স্থায়ী ও একজন অস্থায়ী——বিরুদ্ধে কেস করা হয় ও তাদের বরখাস্ত করা হয় জাল নথি ব্যবহার করার জন্যে।

এই ভাবে জাপানি কতৃপক্ষ ভারতীয় শ্রমিকদের উপর চাপ বৃদ্ধি করতে ২০২০ সালের কোভিড লকডাউনের পর থেকে যাঁরা কাজে যোগ দিতে পারেননি সময়মতন তাদের চার্জশিট দেওয়া শুরু করে এবং জিজ্ঞাসা করে তাদের জরিমানা কেন করা হবে না? এই নিয়ে ২০২১ সাল থেকে তদন্ত শুরু করে জাপানি মালিকপক্ষ ও ৩৪ জনের নাম এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এর পরে, ২০২২ সালের ২১শে অক্টোবর একজনকে, ও ২৩শে ডিসেম্বর দুই জনকে বরখাস্ত করে জাপানিরা। তাদের বিরুদ্ধে জাল নথি ব্যবহার করার অভিযোগ করা হয়।

এর পরে ২০২৩ সালের ৭ই এপ্রিল তিন জন অস্থায়ী ভারতীয় শ্রমিককেও ছাঁটাই করে জাপানি কতৃপক্ষ। এই চলমান ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে ১লা মার্চ ২০২৩-এ কর্মবিরতি পালন করেন ভারতীয় শ্রমিকেরা। এর ফলে ক্ষিপ্ত হয়ে ১৭ই মার্চ কাপুর সহ তিন জন ইউনিয়ন নেতাকে——সাধারণ সম্পাদক অজিত সিংহ ও সাংগঠনিক সচিব সুনীল কুমার——বিনা নোটিসে চাকরি থেকে বহিস্কার করা হয় এবং বাউন্সার ও হরিয়ানা পুলিশ ডেকে তাঁদের কারখানার থেকে জোর করে বের করে দেওয়া হয়।

এ ছাড়াও জাপানি কতৃপক্ষ ভারতীয় শ্রমিকদের বিরুদ্ধে নানা প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ নিতে থাকে বলে বাকি ইউনিয়ন নেতৃত্ব ইস্ট পোস্ট বাংলা কে জানান। ২৯শে মার্চ দুই জন ইউনিয়ন কর্মীকে চার্জশিট দেওয়া হয়, ৩০শে মার্চ দুই জন ইউনিয়ন সদস্য ও দশজন স্থায়ী শ্রমিককেও চার্জশিট দেওয়া হয়।

জাপানি কতৃপক্ষ ভারতীয় শ্রমিকদের উপর আক্রমণ করছে ও নয়া শ্রম কোড প্রয়োগ করে শ্রমিকদের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে অভিযোগ তুলে বাকির শ্রমিকেরা বিরোধিতা তুঙ্গে তুলেছেন। তারা পিঠে তাদের দাবির পোস্টার লাগিয়ে কাজ করছেন। শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি যে গুরগাঁও-মানেসার অঞ্চলে গাড়ি কারখানাগুলোর মধ্যে স্থায়ী শ্রমিকদের অনুপাত যেখানে গড়ে ১৭%, গাড়ির যন্ত্রাংশ বানানোর কারখানাগুলোয় সেই অনুপাত কিন্তু ২% থেকে ৩% মাত্র। এর মধ্যে বাকির শ্রমিকদের মধ্যে প্রায় ৫০% স্থায়ী শ্রমিক ছিলেন এত কাল যা জাপানি কতৃপক্ষ কমিয়ে আনতে চাইছে নতুন শ্রম কোড ব্যবহার করে।

জাতীয়তাবাদের জিগির তুলেও রাজ্যের আর ইউনিয়নের শাসক দল বিজেপি জাপানি কতৃপক্ষ ভারতীয় শ্রমিকদের উপর যে আক্রমণ নামিয়ে আনছে তার বিরোধিতা করছে না। বরং শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্বের অভিযোগ যে পুলিশের মদদে কারখানার মধ্যেই দাপট দেখাচ্ছে জাপানি কতৃপক্ষ দ্বারা ভাড়া করা বাউন্সাররা। শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ নিয়ে কোনো হেলদোল দেখায়নি রাজ্যের শ্রম দফতর। তাই অবিলম্বে তাদের দাবিগুলো জাপানি কতৃপক্ষ কে মানতে হবে বলে দাবি করছে বাকি শ্রমিক ইউনিয়ন। এই বিষয়ে নানা চেষ্টা করেও জাপানি কতৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Leave a comment
scroll to top