Close

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে হৈচৈ কিন্তু IIT-NIT-র ৱ্যাগিং নিয়ে কেন চুপ মূলস্রোতের সংবাদমাধ্যম?

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র মৃত্যু নিয়ে পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে যে ভাবে সরব হয়েছে মূলস্রোতের সংবাদমাধ্যম, সে ভাবে IIT-NIT-IIM নিয়ে কেন হয়নি? কারণ কি ফি স্ট্রাকচার?

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে হৈচৈ কিন্তু IIT-NIT-IIM-র ৱ্যাগিং নিয়ে কেন চুপ মূলস্রোতের সংবাদমাধ্যম?

ছবি: নিজস্ব সূত্র

ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোতে (IITs), জাতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোতে (NITs), কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে (CUs), ভারতীয় ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে (IIMs), ভারতীয় বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (IISER)-এ গত পাঁচ বছরে ৯৮টি ছাত্র আত্মহত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। 

রাজ্যসভার ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) [সিপিআই(এম)] সাংসদ ড ভি শিবদর্শনের প্রশ্নের উত্তরে সংসদে বিবৃতি জারি করে ইউনিয়ন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুভাষ সরকার জানিয়েছেন যে ২০২৩ সালেই সাত মাস ধরে, সরকার কেন্দ্রীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত ছাত্রদের আত্মহত্যার অন্তত ২০টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ২০২২ সালে এই সংখ্যাটা ছিল ২৪।

যদিও গত ৯ই অগাস্ট যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন হস্টেলে র‍্যাগিং এর জন্য ছাত্র মৃত্যু পর মূলস্রোতের সংবাদমাধ্যম গুলো এখনো পর্যন্ত যেভাবে নিয়মিত এই বিষয়ে প্যানেল আলোচনা বসাচ্ছে, ক্যাম্পাসের ভিতর সাংবাদিক পাঠিয়ে প্রতিদিন মদ-গাঁজা-যৌনতার রগরগে প্রমাণ খুঁজে বেড়াচ্ছে, এবং পড়ুয়াদের চরিত্র হণণের মাধ্যমে তাঁদের হয়রানি করছে, তা এখনো পর্যন্ত উক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। 

আমরা ভাবতে পারতাম যে, আগে হয়নি, যাদবপুরের ছাত্র মৃত্যুর পর থেকে হয়তো হবে। মিডিয়া হয়তো বাকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের, IITs, NITs, CUs, IIMs বা IISER-এর র‍্যাগিং এবং ছাত্র মৃত্যুর মতন ঘটনা গুলোতেও সমান মনযোগ দেবে। কিন্তু সেই আশা পূর্ণ হয়নি। 

২০২২ সালের ১৪ই অক্টোবর, মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র, আসামের তিনসুকিয়ার বাসিন্দা ফয়জানে আহমেদের দেহ আংশিক পচে যাওয়া অবস্থায় IIT খড়্গপুরের একটি হোস্টেলের মধ্যে থেকে উদ্ধার করা হয়। প্রথম ময়নাতদন্তে খুনের প্রমাণ না থাকলেও, হাইকোর্টের নির্দেশে দ্বিতীয় ময়নাতদন্তে এই মৃত্যুকে খুন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ময়নাতদন্ত প্রভাবিত করে তদন্ত প্রভাবিত করা বা ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে খোদ IIT খড়্গপুরের কতৃপক্ষের বিরুদ্ধে। 

যাদবপুরের ছাত্র মৃত্যুর ঠিক ছয় দিনের মাথায়, ১৬ই অগাস্ট, কলকাতা হাইকোর্ট ফয়জানের মৃত্যুকে খুন বলা নিয়ে IIT খড়্গপুরের কর্তৃপক্ষের আপত্তি এবং হাইকোর্টের তত্বাবধানে বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠনে আপত্তি খারিজ করে। যদিও যাদবপুরের মতন IIT খড়্গপুর টিভি প্যানেলে জায়গা করে নিতে পারলো না। ফয়জানের মা রেহানা সংবাদ মাধ্যমকে বলেন “কে বলতে পারে, ফয়জানের জন্যে ন্যায়বিচারের দাবি জোরালো ভাবে তোলা গেলে হয়তো যাদবপুরের স্বপ্নদীপের যা হল সেটা হত না!”

এই বছর জুলাই মাসে রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনে জলে ডুবে মৃত্যু হয় জুওলজি অনার্সের প্রথম বর্ষের ছাত্র উজ্জ্বল গোস্বামীর। মৃত ছাত্রের কাকা সুবীর গোস্বামী জানান, “একজন সাঁতার শেখা ছাত্রের কী করে জলে ডুবে মৃত্যু হয় ? আমরা চাই এর পূর্ণাঙ্গ সঠিক তদন্ত হোক এবং দোষীরা শাস্তি পাক।” যদিও যাদবপুরের জন্য যে পরিমাণ সময় বরাদ্দ হয়েছে, তার ছিটেফোঁটাও সময় বরাদ্দ হয়নি রামকৃষ্ণ মিশনে ছাত্রের রহস্য মৃত্যুর জন্য।

যাদবপুরে ছাত্র মৃত্যুর পরেই প্রকাশ্যে আসলো বালিগঞ্জ সাইন্স কলেজ এবং বারাসাতে র‍্যাগিং এর অভিযোগ। এই ক্ষেত্রে অভিযোগের তীর শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠনের দিকে। তবুও মূলস্রোতের সংবাদ মাধ্যম একরোখা ভাবে পড়ে রইলো যাদবপুর নিয়ে।

মূলস্রোতের সংবাদমাধ্যমের কভারেজে দুটি বিষয় চোখে পড়ার মত। প্রথমত, বারবার উল্লেখ করা প্রথম বর্ষের ছাত্রটি উলঙ্গ হয়ে পড়ে থাকার কথা, বার বার নির্দিষ্ট করে বলা “গায়ে একটি সুতোও ছিল না”। একজন ছাত্রের মৃত্যু বা খুন যথেষ্ট নয়, গায়ে একটাও সুতো না থাকাই বার বার গুরুত্ব পাচ্ছে। এটা গণ বিকৃত কামে সুরসুরি দেওয়ার প্রচেষ্টা ছাড়া আর কী?

মূলস্রোতের সংবাদমাধ্যমের কভারেজে কোথাও দ্বিতীয় স্থানে চলে গেল র‍্যাগিং এর কারণে ছাত্র মৃত্যুর ঘটনা। তার জায়গায় চলে এল ক্যাম্পাসে সিসিটিভি, সিনিয়র-জুনিয়ার বিচ্ছিন্নতার এজেন্ডার পক্ষে ওকালতি, বাম/অতিবাম ছাত্র রাজনীতি, শিক্ষার্থীদের যৌনতা, মাদকাসক্তি, ইত্যাদি। এমন সব ইস্যু যার সাথে নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য নির্দিষ্ট অপরাধীদের সাজা দেওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। বরঞ্চ সবাইকে অপরাধী বা সম্ভাব্য অপরাধী ঠাউরে ক্যাম্পাসের মুক্তাঙ্গন বা শিক্ষার্থীদের দর কষাকষির ক্ষমতাকে বড় রকমের আঘাত দেওয়ার এক বড় প্রচেষ্টা চোখে পড়ে।

অবশ্যই সংবাদমাধ্যম বা রাজনৈতিক দলগুলোর একটা বড় অংশ কেন ক্যাম্পাসের ছাত্র রাজনীতির বিরুদ্ধে বৃহত্তর জনমত গঠনের সুযোগ পাচ্ছে, তার দায় ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব কেই নিতে হবে।ক্যাম্পাসের প্রতিটি ছাত্র সংগঠন প্রকাশ্যে সেই আত্মসমালোচনা করেছেও, তবুও আক্রমণের কেন্দ্র ছাত্র রাজনীতি।

ইতিমধ্যে যাদবপুরের ছাত্র মৃত্যুর জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় সহ মিডিয়ার একাংশ কার্ল মার্কসের মতাদর্শকে দায়ি করেছে! একটি দৈনিক সংবাদপত্র সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্তালিনকে টেনে এনে রোমহষর্ক গল্প ফেঁদেছে। তাদের দাবি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের হস্টেল নাকি “স্তালিনীয় অত্যাচারের ল্যাব”!  রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস ক্যাম্পাসে র‍্যাগিং বন্ধের দায়িত্ব নিতে বলেছেন ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সঙ্ঘ (ইসরো) কে! বাম ছাত্র সংগঠন গুলোকে নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে দক্ষিণপন্থীদের তরফে। 

এর মধ্যেই, বুধবার, ২৩শে অগাস্ট, একদল লোক সেনার পোষাকে হাজির হয়েছে ক্যাম্পাসে। তারা নাকি র‍্যাগিং এবং ছাত্র রাজনীতি সব কিছুই বন্ধ করতে চায়। যদিও ভারতীয় সেনা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে যে  উক্ত অদ্ভুতুড়ে ব্যক্তিদের সাথে তাঁদের কোনো সম্পর্ক নেই। একটি মর্মান্তিক ছাত্র মৃত্যুকে কেন্দ্র করে, একাংশ যে এই এইরকম হাস্য কৌতুকের জন্ম দিতে পারে, তা দেখে অবাক হতে হয়।

কিন্তু কেন?

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউশনাল র‌্যাঙ্কিং ফ্রেমওয়ার্ক (NIRF) এর ২০২৩ এর তথ্য অনুযায়ী যাদবপুরের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ দেশে ১০ নং স্থানে আছে। অন্য দিকে শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং বা ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং সাইন্স এন্ড টেকনোলজি’র এর স্থান ৩৫। 

শিবপুরে বিটেক কোর্সের বাৎসরিক সেমিস্টার ফি হল ৭৫,০০০ টাকা। অন্য দিকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সাইন্স ইঞ্জিনিয়ারিং-এ বিটেক এ চার বছরে মোট খরচ ১১,০০০ টাকা মাত্র। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এ বিটেকে ভর্তির সময় ২১০ টাকা নেওয়া হয়, সেমিস্টার ফি ৫৪ টাকা। এমটেক-এর সেমিস্টার ফি কমবেশি  ২,৪০০ টাকা । প্রায় সমস্ত বিভাগেই ফি অত্যন্ত কম। বিজ্ঞান বা কলা বিভাগে আরো অনেক কম। ভূগোলে ভর্তির সময় সারা বছরের ফি নেওয়া হয় ১,৮৬০ টাকা মাত্র।

যাদবপুরে প্রথমবর্ষে বিটেক কোর্সের ফি রসিদ

নিচে দেওয়া চিত্রটি হল যাদবপুরে প্রথমবর্ষে বিটেক কোর্সের ফি রসিদ। এতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কী ভাবে যাদবপুরের কোর্স ফি-র সাথে শিবপুর বা অন্য জায়গার কোর্স ফি-র তারতম্য রয়েছে। 

এটা সম্ভব হয়েছে দীর্ঘকালীন ছাত্র আন্দোলনের জন্যেই। ফলত ঋণ না নিয়েই গরিব নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানরা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পারে। এখান থেকেই আন্দাজ করা যায়, কেন কর্পোরেট প্রচার যন্ত্র যাদবপুরের রাজনৈতিক ইউনিয়ন ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে শিবপুরের সাংস্কৃতিক ইউনিয়নকে বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

পশ্চিমবঙ্গে যাদবপুর বা প্রেসিডেন্সি হল সেই ক্যাম্পাস যেখানে ছাত্র ইউনিয়ন নির্বাচন হয়। ইউনিয়ন গুলো তাসের আড্ডা বা সিট বিক্রির দোকানে পরিণত হয়নি। কতৃপক্ষ নির্বাচন না করালে, ছাত্র সংগঠন গুলো নিজেরাই উদ্যোগ নিয়ে ইউনিয়ন গঠন করে।

ইস্ট পোস্ট বাংলার সম্পাদকীয় কলামে এই পত্রিকার সম্পাদকীয় মতামত প্রকাশিত হয়।

Leave a comment
scroll to top