Close

ইন্ডিয়া জোট কি সংসদের বাদল অধিবেশনের পরীক্ষায় উত্তীর্ন হবে?

সংসদের বাদল অধিবেশনই ছিল ২০২৪ এর সাধারণ নির্বাচনের আগে নব-গঠিত ইন্ডিয়া জোটের জন্যে একটি কঠিন পরীক্ষা। কিন্তু তাঁরা কি পরীক্ষা পাশ করেছে?

ইন্ডিয়া জোট কি সংসদের বাদল অধিবেশনের পরীক্ষায় উত্তীর্ন হবে?

বেশ কিছুদিন আগেই সাড়ম্বরে বেঙ্গালুরুতে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোর বৈঠকে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টাল ইনক্লুসিভ অ্যালায়েন্স (ইন্ডিয়া) জোটের গঠন হওয়ার পর থেকে, বিশেষ করে সংসদের বাদল অধিবেশন শুরুর পর থেকে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-র নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সরকারের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হয়েছেন বিরোধীরা। 

তবে ইন্ডিয়া জোটের সংসদে লাগাতার বিরোধিতার কারণে, বিশেষ করে মনিপুরের পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতি দাবির কারণে, এই অধিবেশনে নানা গুরুত্বপূর্ণ বিল সরকার সহজেই পাশ করিয়ে ফেলেছে সংসদে। পাশ হওয়া বিলগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল খনি এবং খনিজ (উন্নয়ন ও বিধিনিষেধ) সংশোধন বিল, ২০২৩, জঙ্গল (সংরক্ষণ) সংশোধন বিল, ২০২৩, প্রভৃতি। এখন প্রশ্ন হল ইন্ডিয়া জোট সংসদে মনিপুর নিয়ে হৈচৈ করে কি শাসক দল কে নানা ধরণের জনবিরোধী আইন পাশ করতে সাহায্য করছে?

ইন্ডিয়া জোট দাবি করেছে যে প্রধানমন্ত্রী মোদী কে সংসদে মনিপুর নিয়ে বিবৃতি দিতে হবে। এর আগে একটি কুকি মহিলা কে বিবস্ত্র করে রাস্তায় ঘুরিয়ে গণধর্ষণ করার ভিডিও জুলাই মাসে ভাইরাল হওয়ায় পর থেকে মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া মনিপুরের জাতি সংঘর্ষের ঘটনা নিয়ে আবার সরব হতে সক্ষম হয় বিরোধীরা এবং তাঁরা রাজ্য ও ইউনিয়নের শাসকদল বিজেপি কে বিঁধতে শুরু করে।

প্রধানমন্ত্রী মনিপুরের মহিলার উপর হওয়া অপরাধের তীব্র নিন্দা করেন সংসদের বাদল অধিবেশনের শুরুতে, তবে সংসদের বাইরে, সাংবাদিকদের সামনে দেওয়া বিবৃতিতে। তিনি সংসদের কোনো কক্ষে এখনো কোনো বিবৃতি দেননি। আর এই নিয়ে বিরোধীরা শুরুর  থেকেই সরব রয়েছেন। যদিও ইউনিয়নের গৃহমন্ত্রী অমিত শাহ সংসদে বলেছেন যে সরকার সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত, বিরোধীরা তবুও প্রধানমন্ত্রী মোদীর বিবৃতি ছাড়া আর কোনো কিছুতেই আগ্রহী নন।

ফলে যে টানাপোড়েন বিরোধী আর সরকারপক্ষের মধ্যে সংসদের বাদল অধিবেশনে শুরু হয়েছে তাতে ধাক্কা খেয়েছে জনস্বার্থ। খনি বিল পাশ করিয়ে খনি ও খনিজ সংস্থানের উপর বেসরকারি মালিকানা কে সুদৃঢ় করার, সিনেমাটোগ্রাফি আইনের সংশোধন করে “দেশবিরোধী” বলে যে কোনো সিনেমা কে খারিজ করে দেওয়ার পথ প্রশস্ত করে, জঙ্গল সংরক্ষণের নামে প্রকৃত জঙ্গল কে কর্পোরেটদের স্বার্থে কেটে সাফ করে দেওয়ার রাস্তা তৈরি করে সরকার জনস্বার্থে আঘাত করছে বলে অভিযোগ উঠলেও, ইন্ডিয়া জোট সংসদে এইগুলো নিয়ে তেমন আলোচনা করেনি, বরং সংসদ অচল করে বাইরে চলে গেছে। ফলে খুব সহজেই বিজেপি এই সব আইন পাশ করতে সক্ষম হয়েছে। 

দেশের জনগণের দেওয়া করের কোটি কোটি টাকা খরচ করে সংসদের অধিবেশন বসে। অভিযোগ উঠেছে যে বিজেপি আমলে সংসদের চেয়ে বেশি অর্ডিন্যান্স পাশ করে আইন বানানো হয় আর সংসদের কাজের সময়, অধিবেশনের দৈর্ঘ্য কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এখন এই কোটি কোটি টাকা খরচ করে যে অধিবেশন চলছে সেখানে সংসদের উভয় কক্ষে সরকার পক্ষের হাজির করা বিলগুলোর জনবিরোধী চরিত্রগুলো কে প্রকাশ্যে এনে, সরকারের ও প্রধানমন্ত্রীর নানা অস্বস্তিকর বিষয়ে আলোচনা না করতে চাওয়াকে নিয়ে সংসদের ভিতরে কেন ইন্ডিয়া জোট আন্দোলন করছে না? কেন প্রতিটি আইন পাশ হওয়া আটকাতে সুদৃঢ় ভাবে নিজেদের প্রতিরোধ গড়ে তুলছে না?

এই সব না করে যদি কর্পোরেটদের স্বার্থে আনা আইন কে বিনা বাঁধায় পাশ করতে দেওয়ার জন্যে সংসদ ছেড়ে বিরোধীরা বাইরে হট্টগোল করেন তাহলে কি আদতেও জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা হবে? আর এহেন কর্মকাণ্ডের ফলে জনগণের মধ্যেও কি বিরোধীদের ব্যাপক প্রভাব বৃদ্ধি হবে?

ইন্ডিয়া জোট একটি রামধনু জোট। অতীতেও—২০১৯ এর সাধারণ নির্বাচনের সময়—এই রকম জোট গড়ার প্রচেষ্টা হয় বিজেপি কে আটকানোর জন্যে, কিন্তু অভিযোগ যে মোদী হিন্দুত্ব ও উগ্র জাতীয়তাবাদের তাস খেলে সেই যাত্রায় বিপুল ভোটে জিতে যান। নির্বাচন আসতে আর মাত্র কয়েক মাস বাকি। এর মধ্যে যদি সরকারের নীতিগত বিরোধিতা তুঙ্গে তুলে না ধরে, সরকারের নীতির সমালোচনা তীব্র না করে, বিরোধীরা সংসদের বাইরেই থাকেন, তাহলে কি ইন্ডিয়া জোট সত্যিই নিজের বিজেপি বিরোধিতা কে প্রমাণ করতে পারবে। 

মোদী সরকারের জোর করে দিল্লী সরকারের থেকে সমস্ত পরিষেবা চালানোর অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছিল সেটা পরে আবার ইউনিয়ন একটি অর্ডিন্যান্স এনে উল্টে দেয়। সেই বিষয়ে তখন উচ্চবাচ্য না করলেও, কংগ্রেস পার্টি জানিয়েছিল ইন্ডিয়া জোটের ঐক্যের জন্যে তারা এই অর্ডিন্যান্সকে যেই আইন বানাতে সরকার সংসদে বিল আনবে, তাতে তারা দিল্লীর শাসক দল আম আদমী পার্টির সমর্থন করবে ও বিলটি কে পাশ হওয়ার থেকে আটকানোর চেষ্টা করবে। এখন বিলটি লোকসভায়, অর্থাৎ ভারতের সংসদের নিম্ন কক্ষে পাশ হওয়ার পরে রাজ্যসভায়, অর্থাৎ উচ্চ কক্ষে আসতে চলেছে। এখন দেখার বিষয় যে এই বিলটি নিয়ে ইন্ডিয়া জোট সংসদের ভিতরে বিরোধিতা করবে না আবার বাইরে গিয়ে বিজেপির সুবিধা করে দেবে। 

আগামী শীতকালীন অধিবেশনের সময় মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড় ও রাজস্থানে বিধানসভা নির্বাচন থাকায় সংসদে বেশির ভাগ নেতারাই বাইরে থাকবেন। ফলে ইন্ডিয়া জোট গড়ে ওঠার পরে এই বাদল অধিবেশনই প্রথম ও শেষ সুযোগ ছিল মোদী সরকারের নীতিগত বিরোধিতা কে জোরদার করার ও সংসদে একজোটে বিতর্কিত বিলগুলোর বিরোধিতা করা ও তাদের আটকানোর চেষ্টা করা। আর মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই যেহেতু অধিবেশন শেষ হয়ে যাবে, তাই এখন দেখার এই ইন্ডিয়া জোট এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে কি না। 

লেখক

  • সম্পাদক

    ইস্ট পোস্ট বাংলার সম্পাদকীয় কলামে এই পত্রিকার সম্পাদকীয় মতামত প্রকাশিত হয়।

ইস্ট পোস্ট বাংলার সম্পাদকীয় কলামে এই পত্রিকার সম্পাদকীয় মতামত প্রকাশিত হয়।

Leave a comment
scroll to top