Close

মোদীর উপর বানানো বিবিসির তথ্যচিত্রটির রাজনৈতিক তাৎপর্য কী?

মোদীর উপর বানানো বিবিসির তথ্যচিত্রটি নিয়ে রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে ভারতে আর বিদেশে। কিন্তু এই তথ্যচিত্রে এমন কী নতুন তথ্য রয়েছে? আর কেনই বা এই তথ্যচিত্র এখন প্রকাশ করা হল? এর পিছনে কী কোনো রাজনৈতিক অভিসন্ধি আছে?

মোদীর উপর বানানো বিবিসির তথ্যচিত্রটির রাজনৈতিক তাৎপর্য কী?

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপর তৈরি যুক্তরাজ্যের বিবিসির দুই পর্বের একটি তথ্যচিত্র নিয়ে দেশে তুমুল রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে ও আন্তর্জাতিক স্তরেও এর প্রভাব পড়েছে। মোদীর উপর বানানো বিবিসির তথ্যচিত্রটিতে ২০০২ সালের গুজরাট মুসলিম গণহত্যার জন্যে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তাঁকে যেমন দায়ী করা হয়েছে, তেমনি তাঁর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে ভারতে ক্রমবর্ধমান ইসলাম বিদ্বেষ ও মুসলিমদের উপর অত্যাচার বৃদ্ধির জন্যেও তাঁকেই অপ্রত্যক্ষ ভাবে দায়ী করা হয়েছে। 

এই তথ্যচিত্রটির ঘটনা সামনে আসার পরে তড়িঘড়ি মোদীর নেতৃত্বাধীন ইউনিয়ন সরকার এর সম্প্রচার ভারতে নিষিদ্ধ করেছে ও সামাজিক মাধ্যমগুলোর থেকে এই তথ্যচিত্রের ভিডিওগুলো যাতে ভারতীয় দর্শকেরা দেখতে না পান তার ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করেছে। এর ফলে বিরোধীরা এই কর্মকান্ডের তীব্র নিন্দা করেছে ও এটিকে স্বৈরতান্ত্রিক কার্যকলাপ বলে অভিহিত করেছে। বিরোধী কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, ও বামপন্থীরা নানা ভাবে সামাজিক মাধ্যমে ও নানা অঞ্চলে এই তথ্যচিত্রটি প্রদর্শন করে সরকারের বিরোধিতা করেছে। 

মোদীর উপর বানানো বিবিসির তথ্যচিত্রে কী আছে? 

মোদীর উপর বানানো বিবিসির তথ্যচিত্রটি দুই পর্বে প্রকাশিত হয়েছে।  

প্রথম পর্বে দেখানো হয়েছে মোদী কী ভাবে হিন্দুত্ববাদী জঙ্গী সংগঠন হিসাবে চিহ্নিত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) সাথে যুক্ত হন, ধীরে ধীরে এই সংগঠনের সংসদীয় গণসংগঠন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বে উত্তীর্ণ হন এবং সেখান থেকে ২০০১ সালের শেষের দিকে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হন। 

এই পর্বে আরও দেখানো হয়েছে কী ভাবে মোদীর মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন ২৮শে ফেব্রুয়ারি ২০০২ থেকে গুজরাট জুড়ে মুসলিম গণহত্যা চালায় আরএসএস-এর সাথে যুক্ত জঙ্গী সংগঠন হিসাবে চিহ্নিত বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) আর বজরং দল। তাঁর সরকার এই হিংসা দমনে কোনো নির্ণায়ক পদক্ষেপ নেওয়ার থেকে বিরত থাকে। এই গণহত্যা নিয়ে তৎকালীন সময়ে বিবিসি কে দেওয়া মোদীর সাক্ষাৎকারের কিছু অংশও এই পর্বে দেখানো হয়, যেখানে মোদী সব অভিযোগ অস্বীকার করেন ও ব্রিটিশদের থেকে মানবাধিকার নিয়ে ভাষণ শুনতে চান না বলে জানান।  

গুজরাট মুসলিম গণহত্যায় সরকারি হিসাবে ৭৯০ জন মুসলিম সহ প্রায় ১,০৪০ জন নিহত হন। এই ঘটনার জন্যে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে মোদী ও আরএসএস-এর নেতৃত্বাধীন সংগঠনগুলো ২৭শে ফেব্রুয়ারি ২০০২ তে গোধরা স্টেশনে সাবারমাতি এক্সপ্রেসের এস ৯ কোচে আগুন লাগানো কে দায়ী করে, যার ফলে ৫৯ জন হিন্দুত্ববাদী কর্মীদের মৃত্যু হয়। অভিযোগের আঙ্গুল তোলা হয় মুসলিমদের বিরুদ্ধে। গোধরার ঘটনা কে কেন্দ্রি করে ভিএইচপি আর বজরং দল গোটা প্রদেশে মুসলিম গণহত্যা চালায় বলে অভিযোগ।   

পরবর্তী কালে, ভারতীয় রেলের পক্ষে জাস্টিস ইউসি ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিশন জানায় যে এস ৯ কোচে বাইরের থেকে আগুন লাগানো হয়নি, বরং দুর্ঘটনা বশতঃ ভিতর থেকেই আগুন লাগে। যদিও এই ঘটনায় ৩৯ জন সংখ্যালঘু কে দণ্ডিত করে আদালত। মোদীর উপর বানানো বিবিসির তথ্যচিত্রটি গুজরাটের মুসলিম গণহত্যার দায় গোধরা কাণ্ডের উপর চাপিয়েছে।  এর ফলে হিন্দুত্ব্ববাদী সংগঠনগুলোর অভিযোগকেই স্বীকৃতি দিয়েছে।  

এই প্রথম পর্বে সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার হল প্রাক্তন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাক স্ট্র-র সাক্ষাৎকার। স্ট্র বিবিসির কাছে একটি বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। তিনি জানান যে তৎকালীন সময়ে (২০০২-০৩) ভারতে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত ও ব্রিটিশ হাইকমিশন গুজরাটে মুসলিম গণহত্যা নিয়ে একটি তদন্ত করে ও তাতে নাকি মোদী সরকারের দিকেই অভিযোগের আঙ্গুল তোলা হয়েছিল। তবে স্ট্র জানান যে যুক্তরাজ্যের সরকার এই ‘গোপন রিপোর্ট’ কোনোদিনই প্রকাশ করেনি এবং এর উপর কোনো পদক্ষেপও তাঁরা নেননি।  

প্রসঙ্গত ভারতের রাজধানী দিল্লীর থেকে প্রকাশিত দ্য ক্যারাভান ম্যাগাজিন এই রিপোর্টের অস্তিত্ব নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে অভিযোগ করেছে যে এহেন একটি রিপোর্ট সত্যিই সেই সময়ে মোদী ও গুজরাট সরকারের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের সরকারের কাছে জমা পড়লেও সেই নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। যদিও ভারতের মতন ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীন হওয়া দেশের একটি অঙ্গরাজ্যের সরকারের বিরুদ্ধে কী ভাবে ব্রিটিশ সরকার কোনো ‘পদক্ষেপ’ নিতে পারে সেটাও একটি বড় প্রশ্ন।  

এখানে উল্লেখ্য যোগ্য হল যে গুজরাটে মুসলিম গণহত্যার ঘটনার পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের কিছু দেশ ও যুক্তরাজ্যে মোদীর প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল প্রায় এক দশক। ২০১২ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের দ্বারা গঠিত বিশেষ তদন্ত দলটি (সিট) সর্বোচ্চ আদালতে নিজেদের রিপোর্টে মোদী কে নির্দোষ বলে বয়ান দেয়, এবং এর ফলে সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে গুজরাট গণহত্যার ঘটনার থেকে নিষ্কৃতি দেয়। এর পরেই ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত জেমস বেভান এর সহযোগিতায় ও যুক্তরাজ্যে সক্রিয় আরএসএস-এর পররাষ্ট্র সংগঠন হিন্দু স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (এইচএসএস) এর সহায়তায় যুক্তরাজ্যে প্রবেশের অধিকার পান মোদী। এর পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোও তাঁর ভ্রমণের উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে দেয়।  

মোদীর উপর বানানো বিবিসির তথ্যচিত্রটির দ্বিতীয় পর্বে দেখানো হয়েছে যে ২০১৯ সালে দ্বিতীয়বার ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে মোদীর রাজত্বে ইসলাম বিদ্বেষ ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হিংসার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলুপ্ত করে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা লুপ্ত করা, অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের ধ্বংসস্তুপের উপর রাম মন্দির গড়ার প্রক্রিয়া শুরু করা, ইত্যাদি থেকে শুরু করে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দিল্লীতে মুসলিম-নিধন যজ্ঞ ও পরবর্তীতে দেশ জুড়ে সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার বৃদ্ধি পাওয়ার মতন ঘটনা গুলো এখানে উল্লেখ করা হয়েছে।  

দ্বিতীয় পর্বের শুরুতেই বলা হয়েছে যে প্রায় ৩০জন এই তথ্যচিত্রে ভয়ে অংশগ্রহণ করতে চাননি। তবে লেখিকা অরুন্ধতি রায়, লেখক নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়, ক্রিস্টোফ জ্যাফ্রেলট, বিবিসির জিল ম্যাকগিভারিন, দ্য ক্যারাভানের হরতোষ সিং বাল, লখনৌ শহরের সাংবাদিক আলিশান জাফরী, অ্যামনেস্টি ভারতের প্রধান আকার প্যাটেল, বিজেপির স্বপন দাশগুপ্ত ও সুব্রমানিয়ান স্বামী (এখন উগ্র-দক্ষিণপন্থী মোদী সমালোচক) এই পর্বে সাক্ষাৎকার দেন ও নিজেদের মতামত রাখেন। 

এই মতামতগুলো নতুন কোনো দৃষ্টিকোণ যোগ করেনি বরং মোদীর বিপক্ষে ও পক্ষে যে সব কথা সাধারণত বলা হয় সেগুলির পুনরাবৃত্তি করেছে। সামগ্রিক ভাবে মোদী ও তাঁর সরকারের সাম্প্রদায়িক চরিত্র নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং তাঁর অর্থনৈতিক কর্মসূচী এবং তার ফলে ভারতের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সঙ্কট বা সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান ও রুজি-রুটির সমস্যাগুলো আলোচনার থেকে মোটামুটি বাদ গেছে।  

মোদী সমালোচকদের বেশির ভাগই মোদীর সরকারের কর্মকান্ড কে মুসলিম-বিরোধী আখ্যা দিয়েছেন, তবে তাঁর অর্থনৈতিক কর্মসূচীর কারণে যে ভাবে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী ও কৃষিজীবী মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সঙ্কট ঘনীভূত হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়, সেই দিকে পর্যাপ্ত দৃষ্টি দেওয়া হয়নি। ফলে, মোদীর উপর বানানো বিবিসির তথ্যচিত্রটি দেখে মনে হতে পারে যে মোদী সরকারের কর্মকান্ডে দেশের অধিকাংশ হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের উপকার হয়েছে, যা দেশের মূল সমস্যাগুলো কে আড়াল করেছে।  

মোদীর উপর বানানো বিবিসির তথ্যচিত্রটি নিয়ে ভারত সরকারের বক্তব্য  

মোদী সরকারের পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচী মোদীর উপর বানানো বিবিসির তথ্যচিত্রটি কে একটি প্রোপাগান্ডা বলে চিহ্নিত করেন ও বলেন এটি একটি ঔপনিবেশিক মানসিকতার থেকে বানানো হয়েছে। এর জন্যে ভারত সরকার এই তথ্যচিত্রটি নিষিদ্ধ করেছে। 

বিজেপির ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক ও সরকারের বরিষ্ঠ উপদেষ্টা কাঞ্চন গুপ্ত টুইট করে মোদীর উপর বানানো বিবিসির তথ্যচিত্রটি কে “ভারত-বিরোধী” ও “আবর্জনা পূর্ণ” বলে আখ্যা দেন ও বলেন যে নানা মন্ত্রক তথ্যচিত্রটি দেখে জানিয়েছে যে এতে “ভারতের সুপ্রিম কোর্টের কর্তৃত্ব এবং বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে, বিভিন্ন ভারতীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন বপন করা হয়েছে এবং অপ্রমাণিত অভিযোগ করা হয়েছে”। এর ফলেই, গুপ্ত টুইট করে জানান, মোদীর উপর বানানো বিবিসির তথ্যচিত্রটি ভারতের “সার্বভৌম” আইনের অধীনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।  

গুপ্ত মোদীর উপর বানানো বিবিসির তথ্যচিত্রটি কে “জঘন্য প্রোপাগান্ডা” বলে অভিহিত করে বলেন যে এই তথ্যচিত্রটি “ভারতের সার্বভৌমত্ব এবং অখণ্ডতাকে ক্ষুণ্ন করছে এবং বিদেশী দেশগুলির সাথে ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে জনশৃঙ্খলাকে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে প্রমাণিত হয়েছে।” 

উল্লেখ্য, যে তথ্য প্রযুক্তি (মধ্যস্থ নির্দেশিকা এবং ডিজিটাল মিডিয়া নীতিশাস্ত্র) নিয়ম, ২০২১, কে ব্যবহার করে মোদী সরকার বিবিসির তথ্যচিত্রটি কে নিষিদ্ধ করেছে তার উৎস ২০২০ সালের মধ্য ভাগে ইউনিয়ন সরকারের পাঁচ জন ক্যাবিনেট ও চার জন রাষ্ট্র মন্ত্রী কে নিয়ে গঠিত একটি মন্ত্রীদের গ্রূপের সিদ্ধান্ত। এই মন্ত্রীদের গ্রূপ সিদ্ধান্ত নেয় যে বিরোধী মত কে ডিজিটাল মিডিয়ায় কণ্ঠরোধ করতে হবে, তাদের জায়গায় সরকারের প্রচারকদের বক্তব্যগুলো কে তুলে ধরতে হবে ও সংবাদ পরিবেশনের উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ তীব্র করতে হবে। দাশগুপ্ত ও গুপ্তের মতন বিজেপির সাথে যুক্ত প্রাক্তন সাংবাদিকদের এই কাজে যুক্ত করা হয় নানা মূলস্রোতের সরকারপন্থী সম্পাদকদের সাথে।  

বিরোধীদের মতামত  

বিরোধী দলগুলো শুরুর থেকেই প্রধানমন্ত্রী মোদী কে গুজরাট গণহত্যার ঘটনায় দায়ী করে থাকলেও ২০১২ সালে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারা নিয়োগ করা তদন্ত কমিটি তাঁকে নির্দোষ বলে হলফনামা দেওয়ার পরে যেহেতু সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে এই মামলায় অব্যহতি দেয়, তাই তারাও এই বিষয়ে, বিশেষ করে ২০১৯ সালের ভরাডুবির পরে, নিজেদের হিন্দু ভোট বাঁচানোর স্বার্থে আর কোনো বিতর্ক সৃষ্টি করেনি। কিন্তু মোদীর উপর বানানো বিবিসির তথ্যচিত্রটি নিয়ে তারা আবার বিতর্ক শুরু করে।  

তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ ডেরেক ওব্রায়েন এবং মহুয়া মৈত্র এই তথ্যচিত্রের লিঙ্ক টুইটারে শেয়ার করেন। বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর তরফ থেকে রাজধানী নয়া দিল্লীর জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ), জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (জেএমআই), দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় ও আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোদীর উপর বানানো বিবিসির তথ্যচিত্রটি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়, যার ফলে আরএসএস-এর ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) তাদের সংঘাত হয়।  

অভিযোগ উঠেছে যে জেএনইউ, দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়, হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় ও আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়ে এই তথ্যচিত্র প্রদর্শনের সময়ে প্রশাসন বিদ্যুৎ সংযোগ ছিন্ন করে আর এবিভিপি বামপন্থী ছাত্রদের উপর সশস্ত্র আক্রমণ চালায়। এর সাথেই জেএমআই তে প্রদর্শনের জন্যে উপস্থিত বাম ছাত্রদের দিল্লী পুলিশ হেফাজতে নেয় ও একদিন পরে মুক্তি দেয়। কলকাতার প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়েও এই তথ্যচিত্র প্রদর্শনের সময়ে প্রশাসন বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে বলে পড়ুয়ারা অভিযোগ করেছেন। 

বাম-শাসিত কেরলের নানা জায়গায় বিরোধী কংগ্রেস এই তথ্যচিত্রটির গণ প্রদর্শনের ব্যবস্থা করে। এ ছাড়াও বিরোধীরা নানা ভাবে ইন্টারনেটে মোদীর উপর বানানো বিবিসির তথ্যচিত্রটি আপলোড করে তার লিঙ্ক জনসাধারণের সাথে শেয়ার করেন।  

সংসদীয় গণতন্ত্রের কাঠামোয় একটি সংবাদমাধ্যমের বানানো তথ্যচিত্র কে নিয়ে বিতর্ক না করে সেটাকে নিষিদ্ধ করা কে কড়া সমালোচনা করেছে নানা বিরোধী দল। তবে বিরোধীদের অভিযোগ নস্যাৎ করে বিজেপি তাদের ভারত-বিরোধী ও দেশদ্রোহী বলে অভিযুক্ত করেছে।  

আন্তর্জাতিক প্রভাব 

মোদীর উপর বানানো বিবিসির তথ্যচিত্রটি নিষিদ্ধ করা নিয়ে ভারতের ইউনিয়ন সরকার কে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। যদিও যুক্তরাজ্যের শাসক রক্ষণশীল দলের তরফ থেকে প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক বিবিসির তথ্যচিত্রটির বক্তব্যের সাথে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন ও রক্ষণশীল দলের একটা বড় অংশই এই বিতর্কে ভারতের শাসক পক্ষের তরফে দাঁড়িয়েছে, বিরোধী লেবার পার্টি মোদী সরকারের দ্বারা বিবিসির তথ্যচিত্রটি কে নিষিদ্ধ করার কড়া সমালোচনা করা হয়েছে।  

যদিও স্ট্র তাঁর বক্তব্যে মোদীর ভূমিকা নিয়ে যুক্তরাজ্যের সরকারের কাছে জমা পড়া গোপন রিপোর্টের কথা উল্লেখ করেছেন এবং ভারতের দ্য ক্যারাভান ম্যাগাজিন এই তথ্যের অনুসন্ধান করে সেই গোপন রিপোর্টের অংশ বিশেষ প্রকাশ করেছে, সুনাকের সরকার এই বিষয়টি চেপে গেছে ও লেবার পার্টির সমালোচনার জবাবে মোদীর সরকারের সাথে সহযোগিতা করার কথাই বলেছে।

উল্লেখ্য যে যুক্তরাজ্য এখন ভারতের সাথে একটি বৃহৎ বাণিজ্য চুক্তি করতে চাইছে যার ফলে রক্ষণশীল দলের সরকার কোনো ভাবেই মোদী কে চটাতে চাইছে না। রক্ষণশীল দলের হাউজ অফ লর্ডসের সংসদ রামি রেঞ্জার মোদীর উপর বানানো বিবিসির তথ্যচিত্রটির সমালোচনা করে এর প্রকাশের দিনক্ষণের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বিবিসির ডাইরেক্টর জেনারেল টিম ডেভি কে চিঠি লিখে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি ব্রিটেনে ক্রমবর্ধমান হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্ব ও সুনাকের মতন ভারতীয় বংশোদ্ভূত একজনের প্রধানমন্ত্রী হওয়া কে উল্লেখ করে প্রশ্ন করেন যে এই তথ্যচিত্রটি প্রকাশ করার পিছনে কি কোনো পাকিস্তানী কর্মচারীর হাত আছে? 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মোদীর উপর বানানো বিবিসির তথ্যচিত্রটি কে ভারতে নিষিদ্ধ করা কে সমালোচনা করেছে। মার্কিন সরকারের মুখপাত্র নেড প্রাইস বলেছেন যে ওয়াশিংটন ডিসি সর্বদা বিশ্বে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা কে সমর্থন করে ও ভারত সহ সকল দেশ কে মত প্রকাশের স্বাধীনতা সহ সব গণতান্ত্রিক অধিকারগুলোর উপর জোর দিতে বলে।  

প্রাইস বলেন, “আমরা বিশ্বজুড়ে স্বাধীন সংবাদ মাধ্যমের গুরুত্বকে সমর্থন করি। আমরা গণতান্ত্রিক নীতির,  যেমন মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্ম বা বিশ্বাসের স্বাধীনতার, মানবাধিকারের গুরুত্ব কে তুলে ধরি, যা আমাদের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে অবদান রাখে। এটি এমন একটি বিষয় যা আমরা বিশ্বজুড়ে আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে জোর দিই। এটি অবশ্যই একটি পয়েন্ট যা আমরা ভারতেও জোর দিয়েছি করেছি।”  

উল্লেখ্য রিপোর্টার্স সান্স ফ্রন্টিয়ার্স (আরএফপি) এর সমীক্ষায় সারা বিশ্বে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা খুবই উদ্বেগজনক। গত কয়েক বছর ধরে ভারতে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুন্ন হয়েছে ও ভারতের স্থান এখন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার নিরিখে পশ্চিমের মান অনুযায়ী বিশ্বের  ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫০তম, যা ২০২১ সালে ১৪২ ছিল। 

মোদীর উপর বানানো বিবিসির তথ্যচিত্রটি নিষিদ্ধ করা নিয়ে ভারতের ইউনিয়ন সরকার কে সমালোচনা করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান (আইপিআই)। একটি বিবৃতিতে আইপিআই-এর অ্যাডভোকেসি ডিরেক্টর অ্যামি ব্রোউইলেট বলেছেন, “মোদী সরকার স্পষ্টভাবে আইটি নিয়মের অধীনে জরুরী ক্ষমতার অপব্যবহার করছে যাতে তার নীতির যে কোনো এবং সমস্ত সমালোচনাকে দণ্ডিত করা বা সীমাবদ্ধ করা যায়।” 

“আমরা বেসরকারী প্ল্যাটফর্মগুলিকে মোদী সরকারের অত্যধিক বিস্তৃত এবং অযৌক্তিক সেন্সরশিপের দাবির বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করছি,” বলে  ব্রোউইলেট যোগ করেন, “অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলিকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে তারা এই ধরনের কার্যকলাপে সম্মতি দিয়ে ভারতে সমালোচক, সাংবাদিক এবং অ্যাক্টিভিস্টদের নিস্তব্ধ করার জন্য সরকারের চলমান প্রচারাভিযানে সাহায্য করবে না।” 

কেন মোদীর উপর বানানো বিবিসির তথ্যচিত্রটি এখন প্রকাশিত হল? 

মোদীর উপর বানানো বিবিসির তথ্যচিত্রটি যথেষ্ট হৈচৈ সৃষ্টি করলেও এই তথ্যচিত্রটির বর্তমান সময়ে প্রকাশিত হওয়ার ঘটনা যথেষ্ট সন্দেহ সৃষ্টি করে। এই তথ্যচিত্র প্রকাশিত হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই বিজেপির সর্ববৃহৎ কর্পোরেট সহযোগী হিসাবে অভিযুক্ত গৌতম আদানির আদানি এন্টারপ্রাইজ কে স্টক মার্কেটে ছল চাতুরির সাহায্যে নিজের সম্পদ বৃদ্ধি করার অভিযোগ তুলে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ। এর ফলে গত কয়েকদিনে আদানি গোষ্ঠীর শেয়ারের দরে ব্যাপক পতন লক্ষ্য করা গেছে ভারতের বাজারে, ও এই সংস্থায় লগ্নি করা সরকারি বীমা কোম্পানি জীবন বীমা কর্পোরেশন বা এলআইসির শেয়ারেও ব্যাপক ধ্বস নামে।  

এই তথ্যচিত্র ভারতের সাথে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। প্রধানতঃ যুক্তরাজ্যের সাথে বাণিজ্য চুক্তি করার বিনিময়ে ভারত সেদেশে ভারতীয় পড়ুয়া ও ব্যবসায়ীদের জন্যে বেশি ভিসার দাবি করেছে ও ভারতীয়দের সেখানে দীর্ঘকালীন থাকার অধিকারেরও দাবি করেছে যা রক্ষণশীল সরকারের পক্ষে খুবই অসুবিধাজনক।  

ভারতীয় বংশোদ্ভূত সুনাক রক্ষণশীল দলের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন যে ব্রিটিশ ব্যাঙ্কিং লবির সহযোগিতায় সেই লবিও কিন্তু মোদী সরকারের দাবিগুলো ও কার্যকলাপ নিয়ে অখুশি। যুক্তরাজ্যের সরকার ব্রিটিশ কর্পোরেটদের জন্যে ভারতের লগ্নি ও আইনী উপদেশের ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রবেশের অধিকার দাবি করেছে যা নিয়ে মোদী সরকার এখনো কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। এর ফলে ব্যাঙ্কিং লবির চাপ সুনাকের উপর বাড়ছে যাঁকে একদিকে হিন্দুত্ববাদী শিবির কে আর অন্যদিকে ব্যাঙ্কিং লবি কে তোষণ করে নিজের সরকার কে টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে।  

এর মধ্যে, গত এক বছর ধরে ইউক্রেনে চলমান রাশিয়ার বিশেষ সামরিক অভিযান নিয়ে ভারতের ভূমিকাতেও বিরাট অখুশি পশ্চিমা শক্তিগুলো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যৌথ ভাবে যদিও যুক্তরাজ্য সহ ইউরোপীয় দেশগুলো, ইজরায়েল, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া রাশিয়ার বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছে, রাশিয়ার উপর নানা ধরণের নিষেধাজ্ঞা চাপানো সমর্থন করেছে, ভারত সেই দিকে তুলনামূলক ভাবে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতি অনুসরণ করেছে ও রাশিয়ার সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কে মজবুত করে তুলেছে এবং সব নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ভারতীয় টাকা – রুশ রুবলের ভিত্তিতে বাণিজ্য বৃদ্ধি করেছে। ভারত নিজের জ্বালানির চাহিদা রাশিয়ার থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে সস্তায় তেল ও গ্যাস কিনে মেটাচ্ছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় সঙ্ঘ (ইইউ) কে ক্রুদ্ধ করেছে। 

অন্যদিকে চীনের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা চারটি দেশের জোট কোয়াড-এর সদস্য হয়েও ভারত চীনের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচনায় সংঘর্ষে জড়ানোর থেকে বিরত থেকেছে। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পরে ভারত ও চীন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কে রক্ষা করতে ও শান্তিপূর্ণ ভাবে দ্বন্দ্ব নিরসন করার পথে এগিয়েছে। ভারত সাংহাই সহযোগিতা সংগঠন (এসসিও) এর বৈঠকে দিয়েছে আর এই এসসিও বৈঠক ২০২৩ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত হবে।  

২০২০ সাল থেকে সীমান্তে চরম উত্তেজনা বজায় থাকলেও ভারত সরকার বিরোধীদের প্ররোচনা কে উপেক্ষা করে চীনের সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়িয়েছে। ২০২২ সালে ভারত আর চীনের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সর্বকালের রেকর্ড ভেঙেছে। ফলে ভারতের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতের পুতুল হয়ে চীন বিরোধী যুদ্ধে যোগ না দেওয়ায় বা কোয়াডের মঞ্চ থেকে চীন-বিরোধী উস্কানিতে ভাগ না নেওয়ায় পশ্চিমা শক্তিগুলো ভারতের উপর রুষ্ট রয়েছে।  

এহেন পরিস্থিতিতে মোদীর উপর বানানো বিবিসির তথ্যচিত্রটি, যাতে স্ট্র-র মতন একজনের, যিনি নিজে মিথ্যা তথ্য দিয়ে যুক্তরাজ্য কে ইরাক আগ্রাসনে যুক্ত করার দায়ে ও লক্ষ লক্ষ মানুষের গণহত্যায় অভিযুক্ত, অভিযোগ ছাড়া নতুন কোনো তথ্য বা দৃষ্টিকোণ নেই, আখেরে কার লাভ করছে সেটা একটা বড় প্রশ্ন। এই তথ্যচিত্রের মাধ্যমে কি পশ্চিমা শক্তি ভারতের সরকারের বিদেশ নীতি পরিবর্তন করার জন্যে চাপ দিচ্ছে নাকি ব্রিটিশ লগ্নি পুঁজি ভারতের বাজারে নিজের বিস্তার ঘটাবার সুযোগ খুঁজছে, সেই উত্তর এখনো কোনো তথ্যের থেকে পাওয়া যায়নি।  

তবে ইতিপূর্বে দেখা গেছে যে যখনই মোদী কে বা তাঁর নেতৃত্বাধীন বিজেপি কে বিরোধীরা শুধু সাম্প্রদায়িক বলে আক্রমণ করে হারাতে গেছে, তখন মোদী ও বিজেপি সেই প্রচারকে ব্যবহার করে হিন্দু ভোটের ব্যাপক মেরুকরণ করে নির্বাচন জিতে গেছে। তাই যখন অভিযোগ উঠেছে যে ভারতে স্বাধীন সংবাদ মাধ্যমের দিন শেষ হয়ে গেছে , যখন মোদী সরকারের আর্থিক নীতিগুলোর প্রভাব নিয়ে, বা আরএসএস-এর হিন্দু রাষ্ট্রে গরিব মানুষের কী বস্তুগত কল্যাণ হবে সে বিষয়ে বিরোধীদের কোনো জোরদার প্রচার নেই, তখন একটি বিদেশী সংবাদ মাধ্যমের ঘাড়ে চেপে কি বিরোধীরা নির্বাচনী বৈতরণী পার করতে পারবে? মোদীর উপর বানানো বিবিসির তথ্যচিত্রটি তাই কি বিজেপির কাছেই আখেরে শাপে বর হবে? 

Leave a comment
scroll to top