Close

G20 বৈঠকে চীনের সাথে ঝঞ্ঝাটই কী ভারতের তুরুপের তাস?

G20 বৈঠকে অনুপস্থিত পুতিন, শি জিনপিং। এদিকে সুর বদলেছেন মোদীও। মার্কিন পক্ষ আদায়ে কি চীন দ্বন্দ্বই ভারতের হাতিয়ার?

G20 বৈঠকে অনুপস্থিত পুতিন, শি জিনপিং। এদিকে সুর বদলেছেন মোদীও। মার্কিন পক্ষ আদায়ে কি চীন দ্বন্দ্বই ভারতের হাতিয়ার?

G20 বৈঠকে এলেন না চীনা রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং এবং রুশ রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন। অন্যদিকে বৈঠকের দু দিন আগেই ৭ তারিখই হাজির হলেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন। বিমানবন্দরে নেমেই সম্ভলপুরি তালে নেচে উঠলেন শীর্ষ সম্মেলনে আমন্ত্রিত আন্তর্জাতিক মূদ্রা ভান্ডারের (IMF)  ম্যানেজিং ডাইরেক্ট ক্রিস্টিনা জর্জিয়েভা। IMF  শীর্ষকর্তা কারো কাছে তৃতীয় বিশ্বের লক্ষী তো কারো কাছে ঋনের জালে জড়িয়ে ঘটি বাটি চাঁটি করা মহাজন।

যদিও সরকারের প্রধান এবং রাষ্ট্রপ্রধানদের এই সম্মেলনে চীন রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি যোগ না দিলেও যোগ দিয়েছেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং, এবং রুশ বিদেশ মন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ।  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতই  চীন এবং রাশিয়ায় রাষ্ট্রপতির গুরুত্বই বেশী। সুতরাং প্রশ্ন ওঠে চীন রাশিয়া কি এই শীর্ষ সম্মেলনটিকে লোপ্রফাইল ট্রিটমেন্ট দিলো? ভারতে অনুষ্ঠিত এই শীর্ষসম্মেলনে চীন-রাশিয়ার প্রতিপক্ষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপীয় ইউনিয়ন আধিপত্য করবে, এরকম পরিস্থিতি কি আগেই তৈরি হয়ে গিয়েছিলো? সেই প্রশ্ন উঠবে।

চীনের পত্রিকা গ্লোবাল টাইমস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয়দের আক্রমণ করে লিখেছে “দেখা যাচ্ছে নয়াদিল্লি এই অনুষ্ঠানটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে, এই আশায় যে G20 শীর্ষ সম্মেলন সফলভাবে আয়োজনের মাধ্যমে একটি “বৃহৎ শক্তি” হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যারা দাবি করে যে ভারতের পাশে আছে, G20 সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী দেশগুলির মধ্যে “পার্থক্য” কে বাড়িয়ে দেখানোর জন্য দুর্দান্ত প্রচেষ্টা করেছে। তারা তাদের নিজস্ব এজেন্ডাকেই অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্ব প্ল্যাটফর্মে  প্রতিষ্ঠা করতে চায়।”

এর আগে ফেব্রুয়ারিতে দিল্লিতেই অনুষ্ঠিত বিদেশ মন্ত্রী পর্যায়ের  G20 বৈঠকে মোদীর ভাষণের সাথে সেপ্টেম্বরের ভাষণের তুলনা করা যাক। গত ২রা ফেব্রুয়ারি, দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনে অনুষ্ঠিত G20 দেশ গুলোর বিদেশ মন্ত্রীদের বৈঠক শুরু হয়েছিলো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভিডিও বার্তার মধ্যে দিয়ে।

শুরুতেই মোদী স্পষ্ট করে বলেন যে, বৈঠকে উপস্থিত দেশ গুলোর মধ্যে বিভিন্ন প্রশ্নে মতবিরোধ আছে। ভারত চায় সহমতের বিষয় গুলো নিয়েই আলোচনা হোক। এক্ষেত্রে স্পষ্টতই ইঙ্গিত ছিলো রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ বিষয়ে ইইউ-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বনাম রুশ-চীন দ্বন্দ্বের দিকেই।

প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন “আমাদের মানতে হবে যে বহুপাক্ষিকতাবাদ সংকটে আছে।… বিগত কিছু বছরের অভিজ্ঞতা অর্থনৈতিক সংকট,আবহাওয়া পরিবর্তন, মহামারী, সন্ত্রাসবাদ এবং যুদ্ধ এটা স্পষ্ট ভাবে দেখাচ্ছে যে বিশ্ব প্রশাসন ব্যার্থ হয়েছে।” প্রধানমন্ত্রী বলেন “এই ব্যার্থতার ফল সব চেয়ে বেশী ভুগতে হয়েছে উন্নয়নশীল দেশ গুলোকেই… যা ধনী দেশ গুলোর সৃষ্টি। সেই কারণে ভারতের G20 সভাপতিত্ব দক্ষিণ গোলার্ধের আওয়াজ হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। কোনো গোষ্ঠী বিশ্বের নেতা হিসেবে নিজেকে দাবি করতে পারে না, সেই সমস্ত অংশের কথা না শুনে, যারা তাদের সিদ্ধান্তের দ্বারা সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত।”

কিন্তু ৯ই সেপ্টেম্বরের প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে ২রা ফেব্রুয়ারীর ভাষাণের ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা গেল না। মোদী বলেন “বহু বছর পুরনো সমস্যা আমাদের কাছে যা নতুন সমাধান চাইছে, আর এই জন্যে আমাদের মানবকেন্দ্রীক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে আমাদের দায়িত্ব পালন করে এগিয়ে যেতে হবে। বন্ধুরা কোভিড-১৯ এর পর দুনিয়াতে বিশ্বাসের অভাবের সঙ্কট এসেছে, যুদ্ধ এই বিশ্বাসের ঘাটতিকে আরো গভীর করেছে, যদি আমরা কোভিডকে হারাতে পারি তবে আমরা নিজেদের মধ্যে আসা বিশ্বাসের ঘাটতির উপরেও জয় পেতে পারি।”

স্পষ্টতই ফেব্রুয়ারীতে যে ভাবে দক্ষিণ গোলার্ধের গরিব দেশ গুলো বৈদেশিক ঋন সমস্যা, সন্ত্রাসবাদ, আবহাওয়া পরিবর্তন এর জন্য মোদী উত্তর গোলার্ধের ধনী দেশ গুলোকে দায়ী করেছিলেন, এবার দেখা গেল উদ্বোধনী ভাষণ আন্তর্জাতিক বিশ্বাস ভরসার কথাতেই সমাপ্ত হল।

সর্বসম্মতিক্রমে দিল্লি ঘোষণা বা ডিক্লিয়ারেশন গৃহীত হয়েছে। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ আশংকা করেছিলেন যে এই ঘোষণা কে ঘিরেই এক বিরাট ঝামেলা বাধবে। কিন্তু সেরকম কিছুই হয়নি। এটি ভারতের কূটনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় বলা যায়। এই ঘোষণায় সরাসরি রাশিয়ার নাম করে নিন্দা করা হয়নি। মাত্র ৪ বার ইউক্রেনের নাম উল্লেখিত হয়েছে। গত বালি শীর্ষ সম্মেলনের ঘোষণা পত্রে ইউক্রেনের নাম ৪২ বার উল্লিখিত হয়েছিলো। শুধু তাই নয় বালি শীর্ষ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিলেন ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভ্লদিমির জেলেনেস্কিকেও। কিন্তু কিভাবে এবং কেনই বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন দিল্লি ঘোষণার রাশিয়ার প্রতি এই নরম মনোভাব মেনে নিলো?



ভারতের G20 শীর্ষ সম্মেলনে ৭৩টি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, যা এ এযাবৎকালের G20 এর ইতিহাসের সর্বোচ্চ। এর আগে ইন্দোনেশিয়া এবং ইতালির G20 সম্মেলনে  যথাক্রমে ২৭ এবং ৩৬ টি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বলাবাহুল্য রাশিয়ার নাম নিয়ে নিন্দা প্রস্তাব নিয়ে গোঁ ধরে বসে থাকলে আরো গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ব্যাঘাত ঘটতো। স্পষ্টতই রুশ নিন্দার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ কিছুতে পাখির চোখ ছিলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের।

আফ্রিকা ইউনিয়ন কে স্থায়ী সদস্য পদ দিয়ে যেমন G20 কে G21 এ পরিনত করা হয়েছে তেমনি “এক সূর্য এক পৃথিবী, এক গ্রীড” সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। যার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নতুন অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্প। দীর্ঘ দিন ধরে চীনের বেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভ এর ব্যাপক প্রভাবের মোকাবিলায় পালটা কর্মসূচি প্রস্তুত করতে চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপীয় ইউনিয়ন। অবশেষে এই কর্মসূচী রূপায়নে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল দিল্লির সম্মেলনে।



সদ্য সমাপ্ত G20 ভারত-মধ্যপ্রাচ্য ইউরোপ করিডোর, মৌ (MOU) সাক্ষর হয়ে গেছে। সৌদি আরব, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালী এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিলে উদ্যোগ নিয়েছে নতুন অর্থনৈতিক করিডোরের। ভারত থেকে পথে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সেখান থেলে সৌদি, ইজরায়েল, সেখান থেকে গ্রীস হয়ে ইউরোপে প্রবেশ করবে বানিজ্য করিডরটি।

নতুন বানিজ্য করিডর সম্পর্কে হওয়াইট হাউসের প্রকাশিত নথী বলছে যে, এই প্রকল্পের খুটিনাটি নির্দিষ্ট করার জন্য আগামী ৬০ দিনের মধ্যে মৌ সাক্ষরকারী পক্ষ গুলো আলোচনায় বসবে। এর থেকে স্পষ্ট, এই করিডোর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ না করলেও, মার্কিনীরা এই প্রকল্প নিয়ে কতটা তৎপর হয়ে উঠেছে।

প্রসঙ্গত এর আগে ভারত রাশিয়া ইরানের উত্তর দক্ষিণ করিডর এর পরিকল্পনা গৃহীত হয়। এই করিডর ইরান, থেকে আর্মেনিয়া, থেকে রাশিয়া থেকে ইউরোপে প্রবেশ করার কথা ছিলো। ইন্টারন্যাশনাল নর্থ সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডোর নামে যা পরিচিত। এবার নতুন করিডোরে একদিকে যেমন চীনের বেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভ এর মোকাবিলার চেষ্টা করা হয়েছে, তেমনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুপক্ষ রাশিয়া এবং ইরানকেও বাদ রাখা হয়েছে। কিন্তু রাশিয়া চীন ঘনিষ্ঠ ভারতে সৌদি নতুন করিডোর প্রকল্পে আছে।

ভারত-সৌদির মত দেশ গুলো চীন-মার্কিন দ্বন্দ্বকে নিজেদের স্বার্থে পূর্ণ সদব্যবহার করতে পারবে নাকি IMF শীর্ষকর্তার নাচটি ভারতের G20 সম্মেলনের নির্যাস হয়ে দেখা দেবে, সেটা সময়ই বলবে।

লেখক

  • সৌম্য মন্ডল

    সৌম্য মন্ডল একজন আর্থ-সামাজিক এবং ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তিনি ইস্ট পোস্ট বাংলায় মুখ্য সম্পাদক হিসাবে কর্মরত। মূলত উদীয়মান বহু-মেরুর বিশ্বের নানা ঘটনাবলীর তিনি বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করেন।

সৌম্য মন্ডল একজন আর্থ-সামাজিক এবং ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তিনি ইস্ট পোস্ট বাংলায় মুখ্য সম্পাদক হিসাবে কর্মরত। মূলত উদীয়মান বহু-মেরুর বিশ্বের নানা ঘটনাবলীর তিনি বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করেন।

Leave a comment
scroll to top