Close

তুরস্ক-সিরিয়ায় ভূমিকম্প: আন্তর্জাতিক সাহায্যে ভূ-রাজনৈতিক তিক্ততার প্রতিফলন

তুরস্ক ও সিরিয়ায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে অসংখ্য প্রাণহানি হওয়ার পরেও কিন্তু মার্কিন-নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোট সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিভাজনমূলক নীতি নিয়েছে, ভূরাজনৈতিক কারণে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার।

তুরস্ক-সিরিয়ায় ভূমিকম্প: আন্তর্জাতিক সাহায্যে ভূ-রাজনৈতিক তিক্ততার প্রতিফলন

৬ই ফেব্রুয়ারি ভোর রাতে তীব্র ভূমিকম্প হওয়ায় কেঁপে উঠল তুরস্ক, সিরিয়া, ও মধ্য-প্রাচ্যের নানা দেশ।এই ভূমিকম্পের ফলে সবচেয়ে বেশী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে মূলত তুরস্ক এবং সিরিয়ায়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) অনুসারে, ৭.৮-রিখটার মাত্রার ভূমিকম্পটি সিরিয়ার সীমান্ত বরাবর অবস্থিত দক্ষিণ তুরস্কের গাজিয়ানটেপ প্রদেশের নুরদাগি শহরের কাছে ২৪.১ কিলোমিটার গভীরে স্থানীয় সময় ভোর ৪.১৭ তে বিধ্বংসী আঘাত হানে।

প্রাণ বাঁচাতে প্রবল ঠান্ডায় রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হন সাধারণ মানুষ। শীতের ভোরে ভূমিকম্প হওয়ায় অনেকেই ঘুম থেকে উঠে পালাতে অক্ষম হন ও তার ফলে প্রাণহানি বেড়েছে বলে খবর। এখনো পর্যন্ত দুই দেশ মিলিয়ে পাঁচ হাজার মানুষ মৃত বলে জানা গেছে।

তুরস্কের রাষ্ট্রপতি রেজেপ তাইয়িপ এরদোয়ান জানিয়েছে এটা ১৯৩৯ সালের আরজিনকান ভূমিকম্পের পর সবচেয়ে বড় দুর্যোগ। এর আগে ১৯৩৯ সালে ভয়াবহ ভূমিকম্পে ৩২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ১৯৯৯ সালে তুরস্কের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে আরেকটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ১৭ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিলো।

সিরিয়ার সরকারি সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর বর্তমান প্রাথমিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা হয়েছে, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রদেশ এবং সাইটগুলি চিহ্নিত করা হয়েছে যা মূলত আলেপ্পো, হামা এবং লাত্তাকিয়া প্রদেশে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।

৬ই ফেব্রুয়ারি রাশিয়া টুডে জানাচ্ছে, রুশ রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের নির্দেশে চারটি বিমানে ৪০ জন চিকিৎসা কর্মী সহ ১০০ জনের বেশী বিপর্যয় মোকাবিলাকারি দল তুরস্ক এবং সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে।

৬ই ফেব্রুয়ারি গ্লোবাল টাইমস জানিয়েছে চীনা সরকার এবং চীনা জনগণের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং সোমবার তুরস্কের রাষ্ট্রপতি এরদোয়ান এবং সিরিয়ার রাষ্ট্রপতি বাশার আল-আসাদের কাছে শোক বার্তা পাঠিয়েছেন। নিহতদের প্রতি গভীর সমবেদনা এবং শোকাহত পরিবার ও আহতদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। 

চীনের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন জানান তুরস্ক এবং সিরিয়ায় আপৎকালীন মানবিক সাহায্যে প্রদানের জন্য চীন প্রস্তুত।

https://www.facebook.com/spoxwangwenbin/posts/pfbid02A1zdHVMFMUHvDtsntaMMu3dycjS7F9vQSRcVrwdvMbYkxwMDLgjs61968XAdyEEpl

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পৃথক দুটি ট্যুইটে তুরস্ক এবং সিরিয়ার ভূমিকম্পের জন্য শোকজ্ঞাপন করেছে এবং দুই দেশকেই সহায়তা প্রদানের কথা ঘোষণা করেছেন।

প্রথম ট্যুইটে প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন তুরস্কে ভূমিকম্পে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতিতে তিনি দুঃখিত। শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনাও জানান। আহতরা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুক এই কামনা করেন। ভারত তুরস্কের জনগণের সাথে সংহতি প্রকাশ করে এবং এই ট্র্যাজেডি মোকাবেলায় সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত সেটাও জানান।

সম্ভবত প্রথমে তিনি জানতেন না যে সিরিয়াতেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তাই, দ্বিতীয় ট্যুইটে মোদি বলেন, বিধ্বংসী ভূমিকম্প সিরিয়াকেও প্রভাবিত করেছে তা জেনে তিনি গভীর বেদনাহত হয়েছি। নিহতদের পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান মোদী। তিনি লেখেন, “আমরা সিরিয়ার জনগণের দুঃখ ভাগ করে নিচ্ছি এবং এই কঠিন সময়ে সাহায্য ও সমর্থন প্রদানের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ”।

অন্যদিকে মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন ট্যুইট করেন, “তুরস্ক ও সিরিয়ায় ভূমিকম্পে প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞে আমি গভীরভাবে শোকাহত।  আমি আমার টিমকে নির্দেশ দিয়েছি তুরস্কের সাথে সমন্বয় করে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে এবং যে কোনো এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করতে।

ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভোলোদিমির জেলেনেস্কি তুর্কি ভাষায় ট্যুইট করে বলেন, “আমি রাষ্ট্রপতি এরদোয়ান, তুরস্কের জনগণ এবং যারা ভূমিকম্পে প্রাণ হারিয়েছে তাদের পরিবারের প্রতি আমার সমবেদনা জানাই এবং সকল আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি। এই কঠিন সময়ে আমরা তুরস্কের জনগণের পাশে আছি। আমরা দুর্যোগের পরিণতি কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে প্রস্তুত।

ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে দুটি ট্যুইট করা হয়। প্রথমটিতে বলা হয় “তুর্কি সরকারের অনুরোধে, আমি সমস্ত কর্তৃপক্ষকে চিকিৎসা, অনুসন্ধান ও উদ্ধার সহায়তা প্রদানের জন্য অবিলম্বে প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি।”

অন্য একটি ট্যুইটে প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু কে উদ্ধৃত করে বলা হয় “ইজরায়েলের সকল নাগরিকের পক্ষ থেকে, আমি তুরস্কের নাগরিকদের এই কঠিন সময়ে, যে ভূমিকম্প আমাদের অঞ্চলে আঘাত হানে, তাদের জন্য সমবেদনা জানাচ্ছি।”

দেখা যাচ্ছে রাশিয়া, চীন, ভারত সহ বিভিন্ন দেশ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ তুরস্ক এবং সিরিয়ায় উভয়ের জন্য শোক জ্ঞাপন করেছে এবং তাদের উভয়কেই সাহায্য দানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্য দিকে মার্কিন রাষ্ট্রপতি বাইডেন তুরস্ক এবং সিরিয়া উভয় দেশের ভূমিকম্প পীড়িতদের প্রতি শোক জ্ঞাপন করলেও সাহায্যের ঘোষণা করেছে শুধুমাত্র তুরস্কের জন্য। সিরিয়াকে কোনো সাহায্য দানের ঘোষণা করা হয়নি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইউক্রেন এবং ইজরায়েল তুরস্কের জন্য শোকজ্ঞাপন এবং সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিলেও, সাহায্য দূরে থাক সিরিয়ার নাম পর্যন্ত মুখে নেয়নি। প্রসঙ্গ তুরস্ক মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা বা ন্যাটোর সদস্য।

অন্য দিকে সিরিয়া রুশ ঘনিষ্ঠ দেশ। ২০১১ সাল থেকে মার্কিন মদদপুষ্ট “সন্ত্রাসী”দের সাথে গৃহযুদ্ধে দীর্ণ দেশটিতে ২০১৪ সালে সরাসরি বিদেশী সেনা প্রবেশ করে। মার্কিন বোমারু বিমানের হামলায় দেশটি ধ্বংস স্তুপে পরিণত হয়েছে। জ্বালানি তেলের অভাব, মুদ্রাস্ফীতির পর মরার উপর খাঁড়ার ঘা এর মত এই ভূমিকম্প যে দেশটির জনগণের জীবনকে আরো দূর্বিষহ করে তুলবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

ভারত পাকিস্তানের মধ্যে লাগাতার সীমান্ত সংঘর্ষ, কুটনৈতিক তিক্ততা থাকলেও প্রাকৃতিক দূর্যোগে বা বিভিন্ন মানবিক সঙ্কটের সময়ে একে অন্যকে সাহায্য করে থাকে। সেক্ষেত্রে তুরস্ক-সিরিয়া নিয়ে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জোটের ও ইজরায়েলের পক্ষপাতিত্ব মূলক আচরণ অনেক অমানবিকতার পরিচয় দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

এই রকম মানবিক সংকটের পরিস্থিতিতে কিছু রাষ্ট্রনায়কদের ভূরাজনৈতিক তিক্ততার ভিত্তিতে ভূমিকম্প পীড়িত মানুষদের মধ্যে বিভাজন এবং পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ খুবই হতাশ জনক। তবে এই পক্ষপাতদুষ্ট অবস্থান থেকে সরে দাঁড়িয়ে পশ্চিমা শক্তিগুলো যে সিরিয়ার মতন দেশের পক্ষ নেবে, সে আশা বর্তমানে ভূরাজনৈতিক মেরুকরণের ফলে অসম্ভবও বটে।

সৌম্য মন্ডল একজন আর্থ-সামাজিক এবং ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তিনি ইস্ট পোস্ট বাংলায় মুখ্য সম্পাদক হিসাবে কর্মরত। মূলত উদীয়মান বহু-মেরুর বিশ্বের নানা ঘটনাবলীর তিনি বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করেন।

Leave a comment
scroll to top