Close

ইরানে খামেনেই হত্যা: প্রতিবাদে মুখর ভারতের শিয়া মুসলমানরা, অন্যরাও

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার হত্যা ভারতের শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে শোক ও ক্ষোভের ঢেউ তুলেছে — এবং সরকার অশান্তির আশঙ্কায় সতর্কতা জারি করেছে।

ভারতের অনেক শিয়া মুসলমানের কাছে ইরানের ঘটনাবলি এখন আর কেবল দূরের খবর নয়। খামেনেইয়ের মৃত্যু শোককে গভীর করেছে, ক্ষোভকে উসকে দিয়েছে

লখনউয়ের সরু গলিতে জুমার নামাজের পর কালো পতাকা উড়ল। শোকার্ত মানুষ — পুরুষ, নারী, শিশু — সবাই কালো পোশাকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাঈদ আলি খামেনেইয়ের ছবি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে। কেউ কাঁদছেন, কেউ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রইসরাইলের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছেন।

২৮শে ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় খামেনেই নিহত হওয়ার পর ভারতজুড়ে একই ছবি দেখা গেছে। শ্রীনগর থেকে লুধিয়ানা — সর্বত্র প্রতিবাদ। এই ঘটনাপ্রবাহ এখন ইরান প্রশ্নে, ভারতের শিয়া সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে এবং দেশটির বদলে যাওয়া পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে এক গভীর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

নয়াদিল্লির সরকারও এই পরিস্থিতি থেকে চোখ সরায়নি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাজ্য সরকারগুলোকে সতর্ক থাকতে, ধর্মীয় সমাবেশে নজর রাখতে এবং ইরান সংঘাতকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য অশান্তি মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকতে বলেছে।

ভারতের অনেক শিয়া মুসলমানের কাছে খামেনেইয়ের মৃত্যু শুধু রাজনৈতিক ক্ষতি নয় — এটি গভীরভাবে ধর্মীয়ও। হুসাইনি আন্দোলনের ভারত শাখার জ্যেষ্ঠ নেতা ও আইনজীবী মোহাম্মদ হায়দার আব্বাস বলেন, ইরানে হামলার ভারতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। 

ইস্ট পোস্ট বাংলাকে তিনি বলেন, “২০২৬ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ও শিয়া জগতের সর্বোচ্চ ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ আয়াতুল্লাহ সাঈদ আলি খামেনেইকে হত্যার প্রভাবে সত্য-মিথ্যা বিচার করার সামান্য জ্ঞান যাদের আছে, তাদের হৃদয়ে ভারতজুড়ে তীব্র বেদনা ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।”

তিনি আরও জানান, এই প্রতিক্রিয়া কেবল শিয়াদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধর্মীয় গন্ডি পেরিয়ে, এই হত্যাকান্ড ভারতের নানা জাতির মানুষ কে আলোড়িত করেছে বলে তিনি জানান।  “হিন্দু, মুসলমান, খ্রিষ্টান এবং বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ শুধু ইরানে বর্বর হামলার নিন্দাই জানাচ্ছেন না, তারা আবেগগতভাবেও আহত হয়েছেন,” আব্বাস বলেন। 

লুধিয়ানায় জামে মসজিদের সামনে বিক্ষোভকারীরা ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর কুশপুত্তলিকা দাহ করেন। শ্রীনগরের লাল চকে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন এবং ‘মর্সিয়া’ — শোকের কবিতা — পাঠ করেন। পশ্চিম এশিয়ার ঘটনাবলি সুদূর ভারতের সম্প্রদায়গুলোকে কতটা নাড়া দিতে পারে, এই বিক্ষোভ তারই প্রমাণ।

আব্বাস বলেন, মুসলমানদের মধ্যে এই সংকটে এক ধরনের ঐক্য ফুটে উঠেছে। “বিভিন্ন মাজহাবের স্থানীয় মুসলমানরা গভীর শোক ও সংহতির ঢেউ তুলেছেন এবং শিয়া-সুন্নি ঐক্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন — কারণ তারা যুদ্ধের গভীরতা ও এই সংঘাতের ব্যাপকতা অনুধাবন করেছেন,” তিনি জানান। 

ইমাম হুসাইনের উত্তরাধিকারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা হুসাইনি আন্দোলন ইরানের ঘটনাবলিকে এক গভীর ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে। আব্বাস বলেন, খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর সংগঠনে শোক ও দৃঢ়তা — দুটোই দেখা গেছে।

“আমাদের সংগঠন একটি পরিবারের মতো কাজ করে, নিঃশর্তভাবে এবং সম্পূর্ণরূপে ইমাম হুসাইনের মিশনের প্রতি উৎসর্গীকৃত,” আব্বাস বলেন এবং তিনি জানান, সর্বোচ্চ শিয়া ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের শাহাদাতের খবরে সংগঠন স্তব্ধ হয়ে গেছে। তবে তিনি এই মুহূর্তকে ধর্মীয় ইতিহাস ও ত্যাগের আলোয় দেখেন। “কিন্তু সংগঠন এই মহান শাহাদাতে গর্ববোধ করে, কারবালার শিক্ষা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে আরও সাহস, শক্তি ও দৃঢ়তার সঙ্গে মিশন এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে,” তিনি যোগ করেন। 

ইরানে হামলায় ভারতের শিয়া মুসলমানদের ক্ষোভ

শোকের পাশাপাশি খামেনেইয়ের হত্যা ভারতের মুসলমানদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীরা ইরানের নেতার ছবি হাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নিন্দা করেছেন।

আব্বাস বলেন, এই ক্ষোভ হুসাইনি মুসলমানদের মধ্যে বিশেষভাবে প্রকট। “বিভিন্ন মাজহাবের মুসলমান — বিশেষত যে হুসাইনি মুসলমানরা শহীদ খামেনেইকে নিঃশর্তভাবে ভালোবাসেন — তাদের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে,” আব্বাস বলেন। 

এই ক্ষোভ, তিনি ব্যাখ্যা করেন, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরানের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। “এই ক্ষোভের মূল প্রেক্ষাপট হলো — আয়াতুল্লাহ সাঈদ আলি খামেনেইয়ের নেতৃত্বে ‘প্রতিরোধ’-এর শিয়া ইসলামি আদর্শ বাস্তবে প্রমাণিত হয়েছে, বিশেষত ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে,” আব্বাস ইস্ট পোস্ট বাংলা কে বলেন।  তিনি আরও বলেন, ইসলামি বিপ্লবের সাফল্য ও ইসলামি সরকার গঠনের পর থেকে ইরান এই নীতিতে অবিচল রয়েছে।

শিয়া রাজনীতি এবং ভারতে জোট নিয়ে বিতর্ক

এই বিক্ষোভ ভারতের শিয়া সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে পুরনো বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে। কিছু সুন্নি মহল দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে শিয়া সম্প্রদায়ের একটি অংশ — বিশেষত দাউদি বোহরা সম্প্রদায় — ক্ষমতাসীন ডানপন্থী ভারতীয় জনতা পার্টির সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ।

আব্বাস দাউদি বোহরা ও অন্যান্য শিয়া গোষ্ঠীর মধ্যে তুলনাটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। “দাউদি বোহরা সম্প্রদায় মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই শিয়া ইসনা-আশারি (বারো ইমামি) সম্প্রদায় থেকে সম্পূর্ণ আলাদা,” তিনি বলেন। দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পবিত্র গ্রন্থের ব্যাখ্যা ও ঐতিহ্যগত রীতিতে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে — যা তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকেও ভিন্নভাবে গড়ে তোলে, জানান আব্বাস। 

সাম্প্রতিক পুলিশি পদক্ষেপও এই বিতর্কের কেন্দ্রে এসে পড়েছে। বিভিন্ন শহরে শিয়া মুসলমানদের বিক্ষোভে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে বা ছত্রভঙ্গ করা হয়েছে।

আব্বাস এই দমন-পীড়নকে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেন। “বিভিন্ন শহরে শিয়া মুসলমানদের অহিংস বিক্ষোভে সাম্প্রতিক দমন-পীড়নের প্রেক্ষাপট হলো ইসরাইলের সঙ্গে ভারতের সাম্প্রতিক প্রকাশ্য সম্পর্ক জোরদার এবং ২০২৬ সালের ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি,” তিনি বলেন। তিনি অভিযোগ করেন যে এটি ফিলিস্তিনের প্রতি ভারতের ৭৫ বছরের ঐতিহাসিক অবস্থান এবং ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক থেকে হঠাৎ সরে এসে ভারত-ইসরাইল-মার্কিন অক্ষের দিকে ঝুঁকে পড়ার ইঙ্গিত দেয়।

সরকারের সতর্কতা এবং ইরান-সংকটের ভারতীয় প্রতিধ্বনি

ভারত সরকার সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করছে। ২৮শে ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরামর্শপত্রে রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোকে সতর্ক থাকতে বলা হয়।

কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে দেয় যে পশ্চিম এশিয়ার ঘটনাবলি ভারতে, বিশেষত বড় ধর্মীয় সমাবেশ ও জুমার নামাজের সময়, তীব্র আবেগের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। যারা হামলার প্রেক্ষিতে জনতাকে সংগঠিত করার চেষ্টা করতে পারেন, তাদের চিহ্নিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে খুতবা নজরদারিতে রাখতে বলা হয়।

আব্বাস এই পরামর্শপত্রের সমালোচনা করেন এবং বলেন এটি গণতান্ত্রিক অধিকার লঙ্ঘন করে। “একজন দায়িত্বশীল, আইনমান্যকারী ও গণতান্ত্রিক নাগরিক হিসেবে আমি আয়াতুল্লাহ সাঈদ আলি খামেনেইয়ের হত্যা ও ইরানে হামলার বিরুদ্ধে যেকোনো বিক্ষোভ দমনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নতুন পরিপত্রের তীব্র বিরোধিতা জানাচ্ছি,” তিনি বলেন। 

তিনি আরও বলেন, এই পরিপত্র সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। “পরিপত্রটি প্রথম দর্শনেই অসাংবিধানিক — এটি সংবিধানের ১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদের অধীনে গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের মৌলিক অধিকার এবং ২৫ অনুচ্ছেদের অধীনে ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘন করে,” আব্বাস, যিনি একই সাথে একজন আইনজীবী, জোর দিয়ে বলেন।  তিনি আরও বলেন, খামেনেইয়ের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ প্রতিটি মুসলমানের ধর্মীয় কর্তব্য — এবং মার্কিন-ইসরাইলের হামলার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গের বিরুদ্ধে ন্যায়সঙ্গত প্রতিক্রিয়া।

আব্বাস বলেন, এই নির্দেশ দেশের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের সঙ্গে বেমানান। এই নিয়ে তিনি বলেন, “বিশ্বের সর্ববৃহৎ লিখিত সংবিধানের মাধ্যমে বৃহত্তম ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে লালন করার গৌরব বহনকারী একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য এই পরিপত্র সম্পূর্ণ অশোভন।”

ইরান, ফিলিস্তিন এবং ভারতের পররাষ্ট্রনীতির পরীক্ষা

ইরান সংঘাত ভারতের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিতর্ককে নতুনভাবে উসকে দিয়েছে। ভারত ঐতিহাসিকভাবে ইরান ও ইসরাইল — উভয়ের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রেখে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে সমর্থন করে এসেছে।

আব্বাস বলেন, ভারতের উচিত তার ঐতিহাসিক অবস্থান থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া। “বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমরা চাই সরকার সংবিধানে প্রতিফলিত গান্ধীর নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলুক,” তিনি দাবি করেন। 

তিনি ফিলিস্তিন প্রশ্নে মহাত্মা গান্ধীর অবস্থানের উল্লেখ করেন। “মহাত্মা গান্ধীর ফিলিস্তিনের প্রতি একটি স্বচ্ছ, নির্ভেজাল সমর্থনের অবস্থান ছিল এবং তিনি ফিলিস্তিনি ভূমিতে ইসরাইলের অবৈধ দখলদারিত্বের নিন্দা করেছিলেন,” ইতিহাস উল্লেখ করে জানান আব্বাস। 

ভারত ও ইরানের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন তিনি। “বিশ্ব ইতিহাসের পাতায় ভারত ও ইরান এমন দুটি দেশ যারা ঔদ্ধত্যপূর্ণ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের এক অভিন্ন আদর্শ ধারণ করে,” তিনি উল্লেখ করেন। 

তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে ভারত সেই উত্তরাধিকার বিসর্জন দিচ্ছে। “এই ঐতিহাসিক বন্ধনে গর্বিত হওয়ার বদলে, সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্তে সম্পর্ক আরও মজবুত করার বদলে এবং মুক্ত ফিলিস্তিনের পক্ষে সাহসিকতার সঙ্গে সমর্থন জানানোর বদলে বর্তমান সরকার সবচেয়ে ঔদ্ধত্যপূর্ণ, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দিচ্ছে — এটি অত্যন্ত দুঃখজনক,” আব্বাস বলেন। 

ভারতের অনেক শিয়া মুসলমানের কাছে ইরানের ঘটনাবলি এখন আর কেবল দূরের যুদ্ধক্ষেত্রের খবর নয়। খামেনেইয়ের মৃত্যু শোককে গভীর করেছে, ক্ষোভকে উসকে দিয়েছে এবং ইরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ও দ্রুত বদলে যাওয়া বিশ্বব্যবস্থায় দেশটির অবস্থান নিয়ে এক জরুরি প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।

মোহাম্মদ হায়দার আব্বাস হুসাইনি আন্দোলন ভারতের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা ও আইনজীবী। এই সাক্ষাৎকার ২০২৬ সালের মার্চে গ্রহণ করা হয়েছে।

Leave a comment
scroll to top