Close

করমন্ডল এক্সপ্রেস দুর্ঘটনা, নেপথ্যে প্রযুক্তিবিভ্রাট নাকি সরকারি গাফিলতি?

গত দুই দশকে এই নিয়ে তৃতীয়বারের মতো দুর্ঘটনার কবলে করমণ্ডল এক্সপ্রেস। হতাহতের প্রশ্নে অন্যতম ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা বলে একে গণ্য করা হচ্ছে।

ছবি স্বত্ব; PTI

শুক্রবার উড়িষ্যার বালেশ্বরের নিকট বাহানাগা বাজারে ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে দেশ জুড়ে। শোকাচ্ছন্ন বহু পরিবার। গত দুই দশকে এই নিয়ে তৃতীয়বারের মতো দুর্ঘটনার কবলে করমণ্ডল এক্সপ্রেস। হতাহতের প্রশ্নে অন্যতম ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা বলে একে গণ্য করা হচ্ছে। করমণ্ডল এক্সপ্রেস দুর্ঘটনার নেপথ্যে কারণ হিসেবে উঠে আসছে বহু বিশ্লেষণ। কিন্তু কী বলছেন রেল কর্মী এবং বিশেষজ্ঞরা? আসুন দেখে নেওয়া যাক।

গত দুই দশক ধরে পর পর অনেকগুলি বিধ্বংসী রেল দুর্ঘটনা হয়েছে, তবুও গত শুক্রবারের করমণ্ডল ও হামসফর এক্সপ্রেসের মধ্যে সংঘর্ষ জনিত দুর্ঘটনার ধারে কাছেও ঘেঁসে না একটিও। সুদূর অতীতেও কখনো এভাবে তিনটে ট্রেনের সংঘর্ষের সূত্র পাওয়া যায় না। মানবসম্পদ হানির ক্ষেত্রেও এটি অন্যতম বড় দুর্ঘটনা। ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রক সূত্রে খবর অ্যান্টি কোলিশন সিস্টেম ছিলনা যশবন্তপুর এক্সপ্রেস বা করমণ্ডল এক্সপ্রেসে। অন্টি কোলিশন সিস্টেম না থাকার কারণে দুর্ঘটনার ভয়াবহতা বেশি হয়েছে। কিন্তু এর দায় কার? 

করমন্ডল এক্সপ্রেস দুর্ঘটনা, সূত্র; PTI

রেলওয়ে প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশ ক্ষেত্রের কর্মী ও বিশেষজ্ঞদের তরফ থেকে উঠে আসছে অন্য বক্তব্য। তাঁদের মতে লাগাতার বেসরকারিকরণের ফলেই এমন দুর্ঘটনা।

সাউথ ইস্টার্ন রেলওয়ে মেনস্ ইউনিয়নের সদস্য বিপ্লব ভট্টর বক্তব্য ” প্রথমতঃ, ওয়ার্কারদের আনরেস্টেডভাবে কাজ করানো হচ্ছে। এর মূল কারণ কর্মীর অভাব, নিয়োগ বন্ধ। কর্মীদের একটা বড় অংশের আউটসোর্সিং হচ্ছে, কনট্রাকচুয়াল করা হচ্ছে এবং কনট্রাকচুয়াল করতে গিয়ে কাজের পরিমাণ ও গুণগতমান দেখা হচ্ছে না। যদি কোনোও টেন্ডার হয় তখন যিনি বরাত পান তার সাথে দরদাম করে কস্টকাটিং করা হয় ফলে সেই চাপ পড়ে লেবার খরচের উপর। লেবারদের নূন্যতম মজুরিও দেওয়া হয় না ফলত কাজের ওপর তার প্রভাব পড়ছে।” 

গত এক বছর ধরে ভারতীয় রেলে শূণ্য পদের সংখ্যা ৩.১২ লক্ষ, যেখানে স্রেফ দক্ষিণ পূর্ব রেলেই এই সংখ্যা ৩০,০০০ এরও বেশি। কর্মী সঙ্কটের কারণে বর্তমানে কর্মরত কর্মীদের অতিরিক্ত সময় ধরে খাটানো হচ্ছে। মানসিক ও শারীরিক চাপ পড়ছে কর্মীদের উপর। 

ভট্ট আরোও বলছেন “আজকে ডিরেইলমেন্টের মূল কারণ হল, রেলওয়ের ট্র্যাকের যে কাজ হয়, মেনটাইনেন্সের যে কাজ হয় সেই কাজে গাফিলতি। একটা রেককে দুই তিন ঘন্টাও বিশ্রাম দেওয়া হচ্ছে না। ধরুন একটা ট্রেন যদি জগন্নাথ হয়ে হাওড়া ঢোকে তা আবার গীতাঞ্জলি হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। কোনোও রেকের রেস্ট নেই, ফলে ডিরেইলমেন্ট ক্রমশ বাড়ছে। ভারতীয় রেল কম বিনিয়োগে বেশি লাভ করতে চাইছে, সেই কারণে সম্পূর্ণ আউটসোর্সিং-এর পথে এগিয়েছে ভারতীয় রেল এবং এর ফলেই এত মানুষের প্রাণ যাচ্ছে।”

বেসরকারিকরণের ফলে ভারতীয় রেলের রেক অ্যাসেম্বলিং-এর বরাত পাচ্ছে বর্তমানে বহু বেসরকারি সংস্থা। টিটাগড় ওয়াগনস লিমিটেড এমনই একটি সংস্থা যা চলতি বছরে পুণের মেট্রোরেলের রেক অ্যাসেম্বলিং-এরও বরাত পেয়েছে। রেক এবং রেকের যন্ত্রাংশ পুনর্নিমাণ ও সংযুক্তিকরণের সাথে যুক্ত শ্রমিকদের অবস্থা কী? 

রেল লাইন মেরামতে ব্যস্ত রেল শ্রমিকরা, সূত্র; PTI

টিটাগড় ওয়াগনস লিমিটেডের একজন চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকের বক্তব্য “আমাদের অনৈতিকভাবে অতিরিক্ত খাটানো হয়। দেশজোড়া বেকারত্বের কারণে অধিকাংশ সময়ে আমাদের অসুস্থ অবস্থাতেও কাজ করতে হয় স্রেফ কাজ টিকিয়ে রাখার জন্য। তাছাড়া আমাদের নূন্যতম বেতন তো দেওয়াই হয়না উপরন্তু রাতের শিফটে কাজ থাকলে পর্যাপ্ত বিরতিও পাইনা আমরা। অধিকাংশ কাজই কার্যত জোড়াতালি দিয়ে করা হয় যার পরবর্তিতে চেকিংও হয়না। সুস্থভাবে নিয়োগ হলে কর্মীদের উপর চাপ কম পড়বে এবং কাজের প্রতি দায়িত্ব বোধও বাড়বে। বাড়বে গুণগত মানও।”

সূত্র মারফত তথ্য, রেলের সংঘর্ষ মূলক দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য ইন্সটল করা হয়েছে অ্যান্টি কোলিশন সিস্টেম কিন্তু দুর্ঘটনাগ্রস্থ দুটি ট্রেনের একটিতেও ছিলনা এই প্রযুক্তি। দক্ষিণ পূর্ব রেলওয়ের অন্যতম কুলিন ট্রেন শালিমার-চেন্নাই করমণ্ডল এক্সপ্রেস। তবে এই ট্রেনের ক্ষেত্রেই রক্ষণাবেক্ষণের এত অনীহা কেন? কেন তাতে অ্যান্টি কোলিশন সিস্টেম ব্যবহার করা হল না?

ট্রেনের রেক বেলাইন হওয়া নিয়ে পূর্বে বার বার রেল কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছে বিভিন্ন রেল শ্রমিক ইউনিয়ন। কিন্তু সরকারের পলিসি তথৈবচ। এই বিষয়ে সাউথ ইস্টার্ন রেলওয়ে মেনস্ ইউনিয়ন ওয়ার্কশপ ব্রাঞ্চ সেক্রেটারি অজিত কুমার পাঁজা বলছেন, ” কর্মী ঘাটতি যে পরবর্তীতে রেল দুর্ঘটনার পরিমাণ বাড়িয়ে দেবে, এ আমরা বহুদিন ধরে বলছি; আজ তা চোখের সামনে দেখা যাচ্ছে। টেকনিক্যাল মেন্টেনেন্সের চেয়েও বড় বিষয়, এক একটা রেককে ওয়াশিং-এর জন্যও কারশেডে পাঠানো হয় না। দীর্ঘদিন ধরে কর্মী ঘাটতির ফলে বর্তমানে কর্মরত কর্মীদের মধ্যে যে মানসিক চাপ পড়ছে তার প্রভাব কাজের উপর পড়া স্বাভাবিক। তাছাড়াও সস্তায় লেবার আমদানির জন্য কাজের গুণগত মান দেখা হচ্ছে না। শুধু মাত্র সিগনালের সমস্যার জন্য এত বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে না।”

  • গত দুই দশকে তিনবার দুর্ঘটনার সম্মুখীন করমণ্ডল এক্সপ্রেস
  • ২০০৯ সালের দুর্ঘটনায় সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা ১৬, আহত শতাধিক।
  • গত শুক্রবারের ঘটনায় ২৪ ঘন্টার মধ্যে মৃতের সংখ্যা প্রায় তিনশত, আহত হাজারের কাছাকাছি।
  • এই ঘটনায় মৃতের সিংহভাগই অসংরক্ষিত কামরার যাত্রীরা যার অধিকাংশই নিম্নবিত্ত ও পরিযায়ী শ্রমিক।
  • গত চার মাসের মধ্যে ইলেকট্রনিক ইন্টারলকিং সম্পন্ন হওয়ার পর রেক বেলাইন হওয়ার ঘটনা এই নিয়ে দ্বিতীয়।
  • বেসরকারিকরণের ফলে কর্ম সঙ্কোচনের প্রভাব পড়ছে পরিসেবায়। সঙ্কটে যাত্রীসুরক্ষা।
  • অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কর্মীর অভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা টানা ১২ থেকে ১৪ ঘন্টা, এমনকি কোথাও কোথাও টানা ২৪ ঘন্টাও কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, করমণ্ডল এক্সপ্রেস পরিচিত অ্যাম্বুলেন্স অন হুইল নামে। বাংলার একটা বড় অংশের নাগরিক এই ট্রেনটিকেই বেছে নেয় দক্ষিণ ভারতে চিকিৎসা করাতে যাওয়ার জন্য। অন্যদিকে দক্ষিণ ভারতে কর্মরত পরিযায়ী শ্রমিকদেরও প্রাথমিক পছন্দ এই গাড়ি। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ট্রেনের রক্ষণাবেক্ষণে এত অনীহা কেন? 

অধিকাংশ মধ্যবিত্ত তথা নিম্নবিত্ত মানুষেরই বিমান পরিষেবা অবলম্বন করার আর্থিক সঙ্গতি নেই। তবে কি ধরে নিতে হবে যে গড় মধ্যবিত্তের যাত্রী সুরক্ষার চেয়েও কেন্দ্রীয় সরকার বেসরকারিকরণ নিয়ে বেশি ভাবিত। এদিকে বন্দেভারত এক্সপ্রেস প্রধানমন্ত্রী মোদির অন্যতম মাস্টার স্ট্রোক। বন্দে ভারত চালু হওয়ার সাথে সাথেই বিরোধী মহলে বিতর্ক উঠেছিল। বিতর্ক উঠেছিল বন্দেভারতের চাকচিক্য বনাম অন্যান্য লোকাল ও দূরপাল্লার ট্রেনের বাস্তব অবস্থা নিয়ে। যদিও অন্য সব কয়টির মতো এই মাস্টারস্ট্রোকও শুরু থেকেই কটু অভিজ্ঞতার সামিল। বিতর্ক আরোও উস্কে দিল করমণ্ডল এক্সপ্রেস দুর্ঘটনা। ইতিমধ্যেই হতাহতের সংখ্যা সরকারি সূত্র অনুযায়ী প্রায় ৩০০ জন, বেসরকারি সূত্রে এই সংখ্যা আরও অনেক অনেক বেশি। এত হতাহতের একটা অন্যতম কারণ অনিয়ন্ত্রিত এবং অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে যাত্রার ছাড়পত্র দেওয়া নিয়মবহির্ভূত অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে। ফলে অধিকাংশ ট্রেনেরই অসংরক্ষিত কামরাগুলি অফিস টাইমের লোকাল ট্রেনের মতোই ভীড়ে ঠাসা থাকে। ফলে বিপদ হলে আক্রান্তের সংখ্যা হয় হিসেবের বাইরে‌। এছাড়াও দীর্ঘদিনের অভিযোগ, কেউ খতিয়ে দেখেনি রেলের কাজে বরাত প্রাপ্ত বেসরকারি সংস্থাগুলির রেলের মতো একটি ক্ষেত্রে কাজ করার মতো যোগ্যতা আদৌ আছে কিনা। এর আগে  যখন পয়েন্টম্যান তুলে দেওয়া হয় তখনই প্রতিবাদ হয়েছিল, বক্তব্য ছিল এতে দূর্ঘটনার প্রবণতা বাড়বে। করমণ্ডল এক্সপ্রেস দুর্ঘটনায় সিগনালের ত্রুটিও অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে আসছে। অন্যদিকে বর্তমানে দক্ষিণ-পূর্ব রেলওয়ের ১৫০০-রও বেশি ট্রেনে কবচ ব্যবস্থা রয়েছে বলে কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রকের দাবি। যদিও গতকাল দুর্ঘটনাগ্রস্ত করমণ্ডল এক্সপ্রেসে ছিল না এই কবচ ব্যবস্থা। বিশেষজ্ঞদের মত যান্ত্রিক ত্রুটির সাথে সিগনালের ত্রুটি এক হয়ে এই দুর্ঘটনা এই প্রকার ভয়াবহ আকার নিয়েছে। অথচ আগের তুলনায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি গোটা পৃথিবীতেই ব্যবহার করে দূর্ঘটনা ঘটার হার কমে এসেছে। ভারতে সেই প্রযু্ক্তির আমদানি হলেও ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রবণতা নগণ্য।

রেলকে বলা হয় দেশের অর্থনীতির লাইফ লাইন। সরকারী কোষাগারে বিপুল রাজস্ব যোগান দেয় রেল বিভাগ। যদিও রেল বেসরকারিকরণের আগে কেন্দ্রীয় শাসকদল বিজেপির বিভিন্ন সূত্র মারফত বার বার সাধারণ নাগরিকদের মাথায় গেঁথে দেওয়া হয় যে রেল লসে চলছে, যা আগাগোড়া মিথ্যা। এর আগে রেলের বাজেট আলাদাভাবে পেশ করা হতো। নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রীত্বে এনডিএ সরকার রেলের সেই গুরুত্ব খর্ব করে দিয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের একাংশের মত। বর্তমানে সাধারন বাজেটের একটি ক্ষুদ্র অংশ হিসেবে রেল বাজেট পেশ করা হয়। তবুও চলতি অর্থবছরে রেলের বাজেট বেড়েছে ৬ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থ বছরে রেলের বাজেট বেড়েছে বিগত অর্থবছরের তুলনায় ১৭ শতাংশ। এবছর ভারত সরকার প্রতক্ষ আয়করই সংগ্রহ করেছে সাড়ে ষোল লক্ষ কোটি টাকা যা গত বছরের তুলনায় ১৮ শতাংশ বেশি। শুধু তাই নয়, এই প্রত্যক্ষ আয়কর সংগ্রহীত মোট করের মাত্র ৩০ শতাংশ। প্রতিদিন রেলে প্রায় ৩৫ লাখ লোক যাতায়াত করে। অধিকাংশই মধ্য ও নিম্নবিত্ত। ভারতের অর্থনীতির ৭০ শতাংশই যে পরোক্ষ করের উপর নির্ভরশীল তা এই দুই শ্রেণীর মানুষেরই প্রদত্ত কর। কিন্তু এত করের টাকা, এত পরিমাণ বরাদ্দ বাজেটের ফলাফল চোখে দেখা যাচ্ছে কোথায়? সাধারণ মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষের সুরক্ষার দায়ভার কার? প্রশ্ন উঠছেই।

লেখক

  • ইন্দ্রাণী চক্রবর্তী

    ইন্দ্রাণী চক্রবর্তী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর সাংবাদিকতার ছাত্রী ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, যিনি শ্রম, কৃষি ও রাজনীতি নিয়ে রিপোর্টিং করেন।

ইন্দ্রাণী চক্রবর্তী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর সাংবাদিকতার ছাত্রী ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, যিনি শ্রম, কৃষি ও রাজনীতি নিয়ে রিপোর্টিং করেন।

Leave a comment
scroll to top