Close

উমর খালিদ ও গণতন্ত্রের লজ্জার সহস্রতম দিন

হাজার দিন পেরিয়ে গেল উমর খালিদ জেলে। দিল্লি দাঙ্গাকে কেন্দ্র করে UA(P)Aর অন্তর্ভুক্ত মামলার বিচার এখনো শুরু হয়নি। কেমন আছে গণতন্ত্র?


“আমি যে দেখেছি গোপন হিংসা কপট রাত্রিছায়ে,
হেনেছে নিঃসহায়ে
আমি যে দেখেছি প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে
বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে
আমি যে দেখিনু তরুণ বালক উন্মাদ হয়ে ছুটে
কী যন্ত্রনায় মরেছে পাথরে নিষ্ফল মাথা কুটে।”
– প্রশ্ন, রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর, ১৯২১

অতীত সবসময় চিনির মতো মিষ্টি যদি না তার সারমর্ম জানা যায়। ১৩৩৮ সনের পৌষ মাসের কনকনে ঠান্ডায় বিশ্বকবি কলম ধরে উপরিউক্ত কবিতাটি লিখছেন। কেন লিখছেন? প্রেসিডেন্সি জেলে উপচে পড়ছে কয়েদিদের ভীড়। কারা তারা? কী তাদের অপরাধ? তারা বিপ্লবী। অস্ত্র আইন, রাষ্ট্রদ্রোহের মতো গুরুতর মামলায় তারা বন্দী। বন্দী করেছে ইংরেজ সরকার। একের পর এক মুক্তি যোদ্ধাদের ওপর রাষ্ট্রীয় আঘাত কবির মরমকে বেঁধে ফেলেছিল আষ্টেপৃষ্ঠে। তফাৎ শুধু, সেদিন সরাসরি ভারতে চলছিল সাম্রাজ্যবাদী শাসন। আজ রবীন্দ্রনাথ বেঁচে নেই তাই হিন্দুত্ববাদীদের একাংশের কাছে তিনি ‘আইকন’। কিন্তু হলফ করে বলা যায়, আজ যদি তিনি হাড়ে মজ্জায় জ্যান্ত থাকতেন তাহলে তাঁকে আর আলাদা করে ঈশ্বরের দিকে এই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে হত না। তিনি নিজেই থাকতেন ‘বিহাইন্ড দ্য বার’।

ইয়ে, মানে, ভড়কে যাবেন না। আমি এখানে বিশেষ প্রতিবাদ টতিবাদ করছি না। কিন্তু হঠাৎ আজ কেন এই কথা? আজ না আছে ইংরেজ, না আছে তার দহরম মহরমের মূর্ততা। কিন্তু নেই বলেই প্রশ্ন জাগে। প্রশ্ন জাগে, কেন তবে ভারতীয় ‘সংশোধনাগার’ আজও প্রায় ৭০% বিচারাধীন বন্দীর কলরবে ‘মুখর’? আজকের দিনটি আরও উল্লেখযোগ্য কারণ, আজকে মিলিয়ে মোট হাজারটা দিন ছাত্রনেতা উমর খালিদ জেলে আটক। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন, কারণ প্রশ্ন যখন আসে, একা আসে না, সাঙ্গপাঙ্গ নিয়েই আসে। প্রশ্নটা হল, ঠিক কোন অপরাধে একটা মানুষকে এত দিন আটকে রাখা হচ্ছে? তাও আবার তখন, যখন চতুর্দিকে গণতন্ত্রের জয়ডঙ্কা বাজছে?

জাম্প কাট টু ফেব্রুয়ারি, ২০২০

২৩শে ফেব্রুয়ারির প্রাক্কালে, উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) বিরোধী এবং সিএএ-পন্থী বিক্ষোভকারীদের মধ্যে বিরোধ লাগে। এই বিরোধ এমন একটি মোড় নেয় যে পরবর্তী দশ দিনের মধ্যে ৫৩ জনেরও বেশি মতান্তরে ১০০-র বেশি লোকের মৃত্যু ঘটে। আহত হ’ন দুই শতাধিক। দোকানপাট, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় খাল-বিল জলাশয় থেকে অসংখ্য বেওয়ারিশ লাশ পাওয়া যায়।
এটা সকলেই জানে যে শাসকের উদ্দেশ্য ছাড়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কখনই সম্ভব নয়, তা দিল্লীর হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা হোক বা মণিপুরে মৈতৈ-কুকি সংঘর্ষ হোক, বিশেষত যখন ক্ষমতায় কোনোও উগ্র জাতীয়তাবাদী দল অধিষ্ঠিত। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার এর আগে বিভিন্ন রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা কালীন উক্ত রাজ্যগুলিতে সফল ভাবে দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছে (উদাহরণ স্বরূপ গুজরাট দাঙ্গা)। তাই এই দাঙ্গাগুলিকে দাঙ্গা না বলে গণহত্যা বলাই নায্য।
দিল্লি দাঙ্গার ক্ষয়ক্ষতিমূক সরকারি পরিসংখ্যানই থেকে উঠে আসছে, দাঙ্গায় মৃতের দুই তৃতীয়াংশই মুসলমান সম্প্রদায়ের যারা উগ্র জাতীয়তাবাদী হিন্দুদের দ্বারা আক্রান্ত। প্রতক্ষ্যদর্শীদের মতে, দাঙ্গার সময় দিল্লির অলিতে গলিতে মুহুর্মুহু জয় শ্রীরাম ধ্বনিই জানান দেয় আসলে কোন গোষ্ঠী এই গণহত্যায় ইন্ধন দিয়েছে। এখন সাদা চোখে যদি দেখি তাহলে সন্দেহের বশে হলেও কাদের গ্রেফতার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি? অবশ্যই ‘হিন্দুদের’। জানি, কথাটা শুনতে ভীষণ সাম্প্রদায়িক লাগছে। কিন্তু ভারতের মতো ‘সেক্যুলার’ দেশের ততোধিক ‘প্রগতিশীল’ সমাজের সামনে এর উল্টো কথা বললে তা সাম্প্রদায়িক লাগে না। এবং আদতে ঘটেও তাই। দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতে স্রেফ মুসলমান হওয়ার অপরাধে পুলিশ অসংখ্য মানুষকে আটক এবং গ্রেফতার করে। আবারও সরকারি তথ্যই বলছে, মোট ১৬০০ জন গ্রেফতার হয়েছিলেন যার মধ্যে ৫২% মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ। দিল্লি দাঙ্গার দুই বছর পরেও এখনো ২৪৫৬ জন বিচারাধীন বন্দী এবং দুইজন দোষী সাব্যস্ত। এই ২৪৫৬ জনের মধ্যে অবশ্যই গ্রেফতার হওয়া সেই ৪৮% হিন্দুও আছেন।
এখন বিষয় হল, দিল্লি দাঙ্গা চলাকালীন ক্রমাগত সর্বসমক্ষে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে গিয়েছেন। ২৩শে ফেব্রুয়ারী ২০২০-তে কপিল মিশ্র উত্তর পূর্ব দিল্লি জেলার ডিসিপি বেদ প্রকাশ সূর্যের উপস্থিতিতে CAA বিরোধী বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে একটি সমাবেশে প্রকাশ্যে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। মিশ্র তিন দিনের মধ্যে জাফরাবাদ এবং চাঁদবাগ এলাকা থেকে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেওয়ার জন্য পুলিশকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন এবং বিষয় নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ও শান্তিপূর্ণ না থাকার হুমকি দিয়েছিলেন। সেই সমাবেশের পর মিশ্র নিজেই টুইটারে পুলিশকে হুমকি দেওয়ার একটি ভিডিও শেয়ার করেন। কপিল মিশ্রের এই সমাবেশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই No-CAA আর pro-CAA গোষ্ঠির মধ্যে সংঘর্ষ লাগে এবং দাঙ্গা চালু হয়। দুঃখের বিষয়, এই বিষয়ে কপিল মিশ্রর বিরুদ্ধে অভিযোগ সুপ্রিম কোর্ট অবধি এগোলেও তার হাল হকিকত জানা যাচ্ছে না।

আবার আসি উমর খালিদ প্রসঙ্গে। দিল্লি দাঙ্গার ষড়যন্ত্রকারী অভিযোগে উমরকে গ্রেফতার করা হয় ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে। তার বিরুদ্ধে দুটি এফআইআর দায়ের করা হয়। একটি দিল্লি দাঙ্গার ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে অভিযোগ করে এবং অপরটি UA(P)A। প্রথম মামলাটিতে উমর জামিন পেলেও UA(P)A-এর আওতায় মামলাটির জন্য তিনি এখনও জেল হেফাজতে থাকবেন বলেই আদালত জানিয়েছে‌। এই মর্মে উমরের বান্ধবী বনজ্যোৎস্না জানিয়েছে “উমরের বিরুদ্ধে দুটিFIR করা হয়, একটি FIR51 যেটায় তাকে দিল্লি দাঙ্গার ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং FIR101, যেটায় তার বিরুদ্ধে UA(P)A আইনের আওতায় মামলা হয়েছে। প্রথমটিতে উমর জামিন পেলেও UA(P)A মামলাটির এখনও বিচারই শুরু হয়নি। এখন UA(P)A আইনের আওতায় মামলাগুলির কনভিকশনের হার খুবই কম। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত বিচারের অভাবে জীবনের শেষ দিন অবধি জেলে পচে‌।”

এই দিল্লি দাঙ্গার ঘটনায় গত শনিবার দিল্লি হাইকোর্ট নুর মহম্মদ নামের একজন অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস করেছে। এই মামলা প্রসঙ্গে কোর্ট সরাসরি বলেছে যে নিজেদের সুবিধার জন্য পুলিশ মিথ্যা অভিযোগে এনাকে যে গ্রেফতার করেছে শুধু তাই নয়, নিজেদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য ভুঁয়ো সাক্ষী আমদানি করেছে। নুর মহম্মদের মামলিয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে একজন হেড কন্সটেবলকে সাক্ষী হিসেবে পেশ করলে তিনি জানান যে, তিনি স্বচক্ষে দেখেছেন নুর দাঙ্গা পাকাচ্ছিল। এই বক্তব্যের বিষয়ে আদালত জানায়, “একজন পুলিশ যখন দাঙ্গা আটকানোর জন্য যথেষ্ঠ ক্ষমতাধর তখন কিভাবে সে নীরব দর্শকের মতো দেখতে পারেন যে একজন দাঙ্গা করছে? উপরন্তু না তিনি নিজের থানায় এই বিষয়ে রিপোর্ট করলেন, না সাহায্যের জন্য অতিরিক্ত ফোর্স চাইলেন। এ বড় বিভ্রান্তিকর বয়ান। অধিকাংশ সাক্ষীর বয়ানের সাথে এর কোনোও সাযুস্য নেই।” এই মর্মে কোর্ট এই বয়ান বাতিল করে। দিল্লি দাঙ্গা মামলায় পুলিশ প্রশাসন যে অহেতুক সন্দেহবশত যাকে তাকে মিথ্যা মামলায় আটক করেছে, এই বূনুর অন্যতম সাক্ষী।

অন্যদিকে, UA(P)A নিয়ে অতীতে অনেক লড়াই আন্দোলন হয়েছে। বর্তমানে বিরুদ্ধ মত চাপা দেওয়ার জন্য এই মামলায় আটক করা যেন একটা প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে অভিযুক্ত স্ট্যান স্বামীর মতো যাজক হ’ন বা উমরের মতো অ্যাক্টিভিস্ট‌। আমরা এমন একটা সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন সমাজের একটা বড় অংশের বুনিয়াদি সামাজিক বোধ নেই আর রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে গণতন্ত্রের জন্য নূন্যতম ঠাঁই নেই। আজ যে তরুণ সাংবাদিক খবর বলছেন, কাল যে তিনি জেলে থাকবেন না এমন নিশ্চয়তা কারোও কাছে নেই। বরং যেকোনও গণতান্ত্রিক ব্যক্তি যদি একটি ‘বিশেষ সম্প্রদায়’-এর (এই বিশেষণটি মুসলমানদের জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হিন্দুত্ববাদী, উগ্র জাতীয়তাবাদী এমনকি পুলিশ দ্বারাও বিবেচিত হয়) অংশ হন তাহলে তার গারদ যাত্রারই নিশ্চয়তা দেওয়া যায়। আজকের দিনে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জে এন সাইবাবা, স্ট্যান স্বামী, উমর প্রত্যেকে এক লাইনে দাঁড়িয়ে। জেলের দরজার ভেতরে যাওয়ার লাইন। “Nationalism has a way of oppressing others.” -Noam Chomsky

লেখক

  • ইন্দ্রাণী চক্রবর্তী

    ইন্দ্রাণী চক্রবর্তী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর সাংবাদিকতার ছাত্রী ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, যিনি শ্রম, কৃষি ও রাজনীতি নিয়ে রিপোর্টিং করেন।

ইন্দ্রাণী চক্রবর্তী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর সাংবাদিকতার ছাত্রী ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, যিনি শ্রম, কৃষি ও রাজনীতি নিয়ে রিপোর্টিং করেন।

Leave a comment
scroll to top