রুশ রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের ভারত সফরে আসার আগেই নয়া দিল্লীর চাপ বাড়ছে। এই কূটনৈতিক পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে যেন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি না পায় ও ভারতের সাথে পশ্চিমা শক্তিগুলোর সম্পর্কে অবনতি না হয়, সেইটা নয়া দিল্লীর বিদেশমন্ত্রক কে দেখতে হচ্ছে। যদিও পুতিন ভারত সফর করছেন দুই দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের বার্ষিক বৈঠকে যোগ দিতে, যা একটি স্বাভাবিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়া, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের কাছে কিন্তু এটি একটি সমস্যার বিষয়।
এর কারণ ভারতের থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হওয়া পণ্য রপ্তানির উপর অতিরিক্ত ২৫% শাস্তিমূলক শুল্ক চাপিয়েছে রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।
রাশিয়ার থেকে সস্তায় তেল আমদানি করার জন্যে এই অতিরিক্ত শুল্ক ভারতীয় পণ্যের উপর ট্রাম্প প্রশাসন চাপিয়েছে।
এই অতিরিক্ত শুল্কের কারণে ভারতের থেকে রপ্তানি করা পণ্যে মোট শুল্কের হার ৫০% হয়েছে, যার ফলে ভারতের রপ্তানিকারকেরা খুবই সমস্যায় পড়েছেন।
এখন এই অতিরিক্ত শুল্কের বোঝা লাঘব করতে ভারত যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি বাণিজ্য চুক্তির উপর জোর দিচ্ছে এবং নানা ভাবে কূটনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ভারতের রপ্তানিকারকদের, বিশেষ করে বৃহৎ কর্পোরেটদের, বাঁচানোর প্রচেষ্টা করছে, অন্যদিকে নয়া দিল্লী এর সাথে সাথেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথেও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যা আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই হয়ে যেতে পারে বলে কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
এমন সময়ে পুতিনের ভারত সফরের সময় তাঁর সাথে মোদীর হাত মেলানোর, সখ্যতার ছবি এই প্রক্রিয়াগুলোর উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে হচ্ছে।
কিন্তু যেহেতু ভারতের রাশিয়ার তেল ও সামরিক সরঞ্জামের উপর নির্ভরতা রয়েছে এবং ক্রমশ সঙ্কটে জর্জরিত পশ্চিমা বিশ্বের উপর ভারত পূর্ণ ভাবে নির্ভর হতে চায় না, তাই পুতিনের ভারতে আসা নয়া দিল্লীর কাছেও জরুরী।
তবুও রাশিয়ার সাথে ভালো সম্পর্ককে আরও উন্নত করার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপানো শুল্কের বোঝা লাঘব করা এখন ভারতের কাছে বেশি জরুরী হয়ে উঠেছে।
পুতিনের ভারত সফরের আগে মদদের আশ্বাস কি বাস্তব সম্মত?
রাশিয়াও ভারতের সমস্যা উপলব্ধি করতে পারে। পশ্চিমা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের, চাপের কাছে ভারত যে অবশেষে নতিস্বীকার করতে বাধ্য সে কথা মস্কো জানে।
ভারত চীন নয়। তার না আছে বৃহৎ শিল্পের ভিত্তি আর না আছে প্রযুক্তিগত শক্তি যা চীনের মতন ভারতকে পশ্চিমাদের নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার সামর্থ্য যোগাবে। পুতিন এটাও জানেন যে মুখে বহু মেরুর বিশ্ব ও বহুপাক্ষিক সম্পর্কের কথা বলা ভারত আসলে পশ্চিমা শক্তির সমর্থনে নিজেকে দক্ষিণ এশিয়ার ইজরায়েল বানাতে চায়। আর তাই বারবার মোদী যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের সাথে সম্পর্ক ভালো করার প্রচেষ্টা করছেন, বার্তা দিচ্ছেন।
তাই পুতিনের প্রশাসন ক্রমাগত চেষ্টা করে যাচ্ছে ভারতকে নিজের দিকে টেনে রাখতে।
পুতিনের ভারত সফরের প্রাক্কালে তিনি ঘোষণা করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া অতিরিক্ত শুল্কের ফলে ভারতের যে আর্থিক ক্ষতি হবে সেটা তিনি পুষিয়ে দেবেন। যদিও এই রকম কোনো কূটনৈতিক আশ্বাস বাণী খুবই বিরল, তবে পুতিনের সেই দাবি অত্যন্ত অবাস্তব।
রুশ অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি সেই রকম কোনো সুযোগ মস্কোকে দেয় না।
রাশিয়ার সাথে ভারতের বাৎসরিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২০২৪ সালে ছিল ৬,৮৭০ কোটি মার্কিন ডলারের। এর মধ্যে ভারতের রাশিয়াতে করা রপ্তানির পরিমাণ ৪৮৮ কোটি মার্কিন ডলার, এবং সেই একই সময়ে ভারত আমদানি করেছে ৬,৩৮৪ কোটি ডলারের পণ্য। এর মধ্যে রাশিয়ার তেলের পরিমাণই বেশি। ভারত-রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ভারতের পক্ষে ঘাটতির পরিমাণ ২০২৪ সালে ছিল ৬,৩৮২ কোটি ডলার।
অন্যদিকে, একই বছরে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র ১২,৯২০ কোটি মার্কিন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য করে। এর মধ্যে ভারত ৪,১৮০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করে আর যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করেছিল ৮,৭৪০ কোটি ডলারের পণ্য। ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ভারতের পক্ষে উদ্বৃত্ত ছিল ৪,৫৭০ কোটি ডলার।
এখন পুতিনের আশ্বাস কে যদি মেনে নিতে হয় তাহলে বিশ্বাস করতে হবে যে রাশিয়া ভারত কে ৪,৫৭০ কোটি ডলারের কাছাকাছি অতিরিক্ত বাণিজ্য করতে দেবে।
কিন্তু সেটা কোন কোন ক্ষেত্রে দিতে পারে?
প্রথমত, নিষেধাজ্ঞার কারণে ভারত কোনো ভাবেই রাশিয়ার যুদ্ধাস্ত্রের বাজার ধরতে পারবে না, যদিও ইউক্রেন সংঘাতের কারণে সেই বাজারে সামরিক পণ্যের চাহিদা ক্রমবর্ধমান।
দ্বিতীয়ত, সেই একই কারণে কিন্তু ভারত কোনো ভাবেই রাশিয়ার সাথে উন্নত প্রযুক্তি, চিপস নির্মাণ বা উন্নত কম্পিউটিং এর বাণিজ্য বা সহযোগিতা করতে পারবে না। ফলে যে সম্ভামনাময় নতুন শিল্পগুলো গড়ে উঠছে সেখানে রাশিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে কাজ করা অসুবিধার ব্যাপার।
তৃতীয়ত, যেহেতু পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নত করার কথা বলেও ভারত ও চীনের মধ্যে বিবাদ বিদ্যমান, এবং রাশিয়া ও চীন রণনীতিগত ভাবে দুটি শরিক দেশ পশ্চিমা বিশ্বের আস্ফালনের বিরুদ্ধে, পশ্চিমা শক্তির উপর নির্ভরশীল মোদী সরকার কখনোই মস্কোর সাথে নিজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, উদীয়মান শিল্পগুলোয় ব্যাপক ভাবে সহযোগিতা করতে চাইবে না।
এগুলো বাদেও রাশিয়ার নিজের অর্থনীতি কোনো ভাবেই ভারতের পাশে দাঁড়ানোর মতন বাস্তব পরিস্থিতিতে নেই।
রুশ অর্থনীতি কি ভারত কে বাঁচাতে পারবে?
পশ্চিমা বিশেষজ্ঞদের সমস্ত হিসাব উল্টে দিয়ে রুশ অর্থনীতি যুদ্ধের আবহে ২০২৪ সালে মোট দেশীয় উৎপাদন (জিডিপি) ৪.১% হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু পুতিনের আশ্বাস মতন এই অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমানে ভারতের জন্যে কোনো লাভজনক সুযোগ তৈরি করতে পারবে না।
ভারত-রুশ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যের অর্ধেক। তাও আবার বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রাশিয়ার খাতায় থাকে। আবার তেল ক্রয় করা বন্ধ করলে ভারত-রুশ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে বিশাল পতন হবে। করোনা অতিমারীর আগে ভারত-রুশ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য হতো ১,০০১ কোটি মার্কিন ডলারের।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে, যখন মোদী ও পুতিন তাঁদের প্রথম বার্ষিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের প্রক্রিয়া শুরু করেন, তখন তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে দুই দেশের বাণিজ্য বৃদ্ধি করে ২০২৫ সালের মধ্যে ৫,০০০ কোটি ডলার করতে হবে। আর ইউক্রেন যুদ্ধ সেই সুযোগ তৈরি করে দেয় রাশিয়ার থেকে তেল আমদানির মাধ্যমে।
সেই সময়েই দুই নেতা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে ২০৩০ এর মধ্যে দুই দেশের বাণিজ্য ১০,০০০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে। সেটা বাস্তবায়িত হলেও বর্তমান ভারত-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের চেয়ে ভারত-রুশ বাণিজ্য অনেক পিছিয়েই থাকতে চলেছে।
যখন পুতিন ভারত কে আশ্বস্ত করতে বলেন যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের জন্যে হওয়া ক্ষতি পুষিয়ে দেবেন তখন সেটা কিসের ভিত্তিতে বলেন তার কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশ নেই। তবে এটা স্পষ্ট যে অর্থনীতির হিসাব দেখাচ্ছে রাশিয়ার পক্ষে সেটা করা অসম্ভব।
বর্তমানে ভারতের থেকে রাশিয়ায় ওষুধ, সার, প্রভৃতি আমদানি বেড়েছে কারণ অনেক পশ্চিমা কর্পোরেট সংস্থা ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। তবুও পুতিনের কাছে সমরাস্ত্র ছাড়া এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে ভারত ৪,৫০০ কোটি ডলার বা তার বেশি মূল্যের বাজার পেতে পারে।
এ ছাড়াও, ২০২৪ সালের হিসাবে, রুশ ফেডারেল বাজেটে ঘাটতি হলো জিডিপির ১.৭%, অর্থাৎ ৩,৪৫০ কোটি ডলার। এই মুহূর্তে পুতিন কে যদি বাজার থেকে ঋণ নিয়ে ভারতের ঘাটতি পূরণ করতে হয়, তাহলেও তাঁকে তাঁর নিজের দেশের বাৎসরিক বাজেট ঘাটতির চেয়েও বেশি ঋণ নিতে হবে, যা কোনো স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে একটি যুদ্ধে জড়িত দেশ করে না।
পুতিনের ভারত সফর: মস্কোর সীমাবদ্ধতা ও নয়া দিল্লীর বাস্তবতা
ফলে, তাঁর আশ্বাস সত্ত্বেও ভারতের জন্যে না আছে পুতিনের কাছে নয়া বাজার আর না আছে ক্ষতিপূরণ করার ক্ষমতা। আর এর ফলে মোদীও যে তাঁকে করমর্দন করেও, আলিঙ্গন করেও, বহু মেরুর বিশ্ব গড়ার কথা বলেও যে শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা শক্তির দিকেই ঝুঁকবেন, ট্রাম্পকেই তোষণ করবেন, সে কথাও পুতিন বিলক্ষণ জানেন। আর তাই, স্রোতের বিরুদ্ধে চলে তিনি, তাঁর সরকার আর সংবাদ মাধ্যম ক্রমাগত চেষ্টা করে যাবে ভারতের উপর রাশিয়ার প্রভাব ধরে রাখতে।
তবে কোনো শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি ও বিকল্প ছাড়া সে সব প্রয়াস যে কোনো কাজেই আসবে না তার ইঙ্গিত বর্তমানেই দেখা যাচ্ছে। পুতিনের ভারত সফর তাই কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার বাইরে খুব বেশি কিছু দিতে পারবে বলে মনে হয় না। আর অতিরিক্ত মোদী নির্ভরতা রাশিয়ার সাথে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলির সম্পর্ককেও তিক্ত করতে পারে, যা দীর্ঘকালীন মেয়াদে এই উত্তপ্ত অঞ্চলে মস্কোর ভূরাজনৈতিক স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।



