১লা মার্চের ভোররাতে ইরান সরকার নিশ্চিত করেছে যে আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলি খামেনি ২৮শে ফেব্রুয়ারি তাঁর বাসভবন সংলগ্ন দপ্তরে লক্ষ্য করে চালানো হামলায় নিহত হয়েছেন। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর থেকে ইরান সরকার গোপন স্থান থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং ইসলামিক বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতার পরিস্থিতি নিয়ে একটি ধোয়াঁশা ছিল।
ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইসলামিক রিপাবলিক নিউজ এজেন্সি (আইআরএনএ) জানিয়েছে, “ইসলামি বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি শনিবার সকালে জায়নবাদী শাসনব্যবস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় শাহাদাত বরণ করেছেন।”
আইআরএনএ আরও জানায়, “বিপ্লবের নেতার শাহাদাতের পর মন্ত্রিপরিষদ ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ও ৭ দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে।”
২৮শে ফেব্রুয়ারি সকালবেলার থেকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপর যৌথ আক্রমণ শুরু করে ইসলামিক শাসন ব্যবস্থা উচ্ছেদ করে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্যে।
এর আগে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের তথ্যের ভিত্তিতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছিলেন যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ নেতাকে তাঁর বাসভবনে সকালের হামলায় হত্যা করা হয়েছে। ইরান সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছিল যে খামেনিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এমনকি ঘোষণা করা হয়েছিল যে তিনি সরাসরি টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন, কিন্তু শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সেটি না হওয়ায় জনমনে ব্যাপক কৌতূহল ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়।
খামেনির নীরবতায় সৃষ্ট এই বিভ্রান্তির সুযোগ নিয়ে ইসরায়েলি গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের প্রচারকরা তাঁর মৃত্যুর দাবিকে আরও জোরালোভাবে ছড়িয়ে দেয়। ইরানের কর্মকর্তারা এটিকে একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের কৌশল বলে অস্বীকার করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর স্বীকৃতি ইসলামি প্রজাতন্ত্র এবং প্রতিরোধের অক্ষের বিভিন্ন সংগঠনের জন্য এক বিরাট ধাক্কা হয়ে এসেছে।
ইরান নিশ্চিত করেছে যে সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা অ্যাডমিরাল আলি শামখানি — যিনি ২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধে আগেই আহত হয়েছিলেন — এবং ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ডস কোরের (আইআরজিসি) কমান্ডার মেজর জেনারেল পাকপুরও একই হামলায় তাঁর সঙ্গে নিহত হয়েছেন।
এর আগে নেতানিয়াহুর দাবির পরেই যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পও দাবি করেন যে হামলায় আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত হয়েছেন এবং তিনি খামেনিকে পৃথিবীর “সবচেয়ে দুষ্ট মানুষ” বলে অভিহিত করেন।
৮৭ বছর বয়সী খামেনি ১৯৮৯ সালে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মুখ্য রূপকার পূর্ববর্তী আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর থেকে ইরানের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। একজন আলেম ও সৈনিক হিসেবে ইরানের নীতিনির্ধারণে তাঁর প্রভাব ছিল অপরিসীম।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর ১৯৮০-র দশকের ইরাক-ইরান যুদ্ধে খামেনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোতেও ব্যাপক মূল্যস্ফীতি ও সংকটের মাঝে একটি স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার কৃতিত্বও তাঁকে দেওয়া হয়।
সাবেক ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে গভীর শত্রুতার কারণে খামেনির নেতৃত্বাধীন ইরান ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন-ব্রিটিশ আগ্রাসনের সরাসরি বিরোধিতা করেনি; তবে তিনি শীঘ্রই বুঝতে পেরেছিলেন যে আফগানিস্তান, ইরাক ও পাকিস্তান — এই তিন দিক থেকে মার্কিন সেনাবাহিনীর উপস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে ইরানের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনের আমলে যেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু শক্তি বিকাশ সংক্রান্ত বারাক ওবামা জমানার চুক্তি বাতিল করে দেয়, তখন থেকেই খামেনির নেতৃত্বে ইরান পশ্চিমা বিশ্বের প্রভুত্বের বিরুদ্ধে উদীয়মান চীন-রুশ জোটে যোগ দেয়।
খামেনির নেতৃত্বের আমলে ইরান একটি আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়, প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় এবং ২০১১ সাল থেকে মিত্র বাহিনীর মাধ্যমে ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনে সালাফি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যায়।
পশ্চিম এশিয়ার একাধিক জায়নবাদ-বিরোধী ও সালাফি-বিরোধী জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত প্রতিরোধের অক্ষ তাঁরই সৃষ্টি। ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই অক্ষ ইসরায়েলকে সদা সতর্ক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। খামেনির সামরিক কৌশলই আইআরজিসিকে পশ্চিমা মদদপুষ্ট ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড সিরিয়ার (আইএসআইএস) সন্ত্রাসীদের — যারা ইরাক ও সিরিয়া দখলের চেষ্টা করেছিল — বিরুদ্ধে লড়াই করে পরাজিত করতে সক্ষম করেছিল। তাঁর হস্তক্ষেপেই লেবাননের হেজবোল্লাহ ও আইআরজিসি সৈনিকেরা একযোগে আইএসআইএস ও আল কায়দার হাত থেকে সিরিয়ার সাবেক বাথ সমাজতান্ত্রিক সরকারকে রক্ষা করে।
তাঁর নির্দেশনায় ইরান একটি বহুমেরু বিশ্ব গড়ার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ শুরু করে। ইরান ব্রিকসের সদস্যপদ লাভ করে এবং সাংহাই সহযোগিতা সংগঠনের শীর্ষ সম্মেলনেও আমন্ত্রিত হয়ে অংশগ্রহণ করে।
ইরানের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির প্রধান উদ্যোক্তা হিসেবে তাঁকে বিবেচনা করা হয় — যে কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল জোর করে বন্ধ করতে চায়।
পাশাপাশি, ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র শিল্পের বিকাশেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ইরানের বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতেও তেহরান তাঁর অবদানকে স্বীকার করে।
দীর্ঘদিন ধরেই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র খামেনিকে হত্যার চেষ্টা করে আসছিল। কিন্তু তাদের অনেক পরিকল্পনাই ব্যর্থ হয়েছে। তবে ২০২৪ সালে সাবেক ইরানি প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি নিহত হওয়ার ঘটনা এবং প্রতিরোধের অক্ষের বিপর্যয় এটি স্পষ্ট করে দেয় যে ইসরায়েল দেশের গভীরে এবং শীর্ষ নেতৃত্বকেও আঘাত করতে সক্ষম। ২০২৫ সালের জুন মাসে ইসরায়েলের হামলায় খামেনি বেঁচে গিয়েছিলেন। আশঙ্কা ছিল যে দেশের শীর্ষ মহলে ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়া মোসাদের তৎপরতার কারণেই বারবার বিঘ্নিত হয়েছে খামেনি ও তাঁর সহকর্মীদের সুরক্ষা। ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটি তার গুপ্তচর-বিরোধী ব্যবস্থা কে কার্যকর করতে অপারগ থেকেছে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের ধাক্কার পরেও।
রাইসিকে আয়াতুল্লাহ খামেনির অঘোষিত উত্তরসূরি বিবেচনা করা হত। কিন্তু ২০২৪ সালের মে মাসে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়াকে নাড়িয়ে দেয়। এই পদের জন্য কয়েকজন আলেম প্রতিযোগিতায় আছেন। তবে ইরানের সূত্রগুলো জানাচ্ছে, পদটি তাঁর কাছেই যাবে যিনি খামেনির প্রতিষ্ঠিত বা প্রভাবিত দৃঢ় পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষানীতি অব্যাহত রাখতে সক্ষম। বর্তমানে রাষ্ট্রপতি ডঃ মাসুদ পেজেশকিয়ান ও দুইজন শীর্ষ কর্মকর্তা বর্তমানে একজন সর্বোচ্চ নেতার অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম যৌথ ভাবে পরিচালনা করবেন। ইরান সরকার খামেনি হত্যার বদলা নেওয়ার দৃঢ় সংকল্প নিয়েছে বলে বার্তা সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে।



