সারা বিশ্বের নজর এখন আরব সাগরের হরমুজ প্রণালী ও সমগ্র পশ্চিম এশিয়ার দিকে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, যেকোনো মুহূর্তে ইরানের ওপর হামলা চালাতে পারে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী। এই যুদ্ধাবহ পরিস্থিতিতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ইসরায়েল সফর।
বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী আজ বৃহস্পতিবার ইসরায়েল ত্যাগ করার পরই ইরানের ওপর চূড়ান্ত হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে এগোবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। মোদী ইসরায়েলে অবস্থানকালে ভারতের অনুরোধে তেল আবিব ইরান আক্রমণ স্থগিত রেখেছে বলেও সূত্রের দাবি।
এর আগে রাশিয়ার রাষ্ট্র-পরিচালিত সংবাদমাধ্যম আরটি উচ্চপদস্থ ইরানি গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে দাবি করেছিল, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানে হামলা না করে ইসরায়েলকে দিয়ে সেই কাজ করাতে পারে। এ সামরিক কর্মকাণ্ডে ভারত, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সংযুক্ত আরব আমিরশাহিও হামলাকারীদের সহায়তা দিতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পর্যবেক্ষকদের মতে, এ পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ স্পষ্ট হচ্ছে।
ট্রাম্পের ইরান হামলায় ভারতের সহযোগিতা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০০৩ সালের ইরাক আগ্রাসনের আদলে পশ্চিম এশিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলে বড় মাপের সেনা মোতায়েন করেছেন এবং সামরিক আগ্রাসনের পথে অগ্রসর হচ্ছেন। তিনি মার্কিন নৌবাহিনীর বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড এবং পারমাণবিক শক্তিচালিত ইউএসএস এব্রাহাম লিঙ্কনকে হরমুজ প্রণালীতে মোতায়েন করেছেন।
এ মোতায়েনে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল ব্যয় হয়েছে এবং সে কারণে ওয়াশিংটন এখন পিছু হটবে না—এমন দাবিও করা হয়েছে। যদিও ওমানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র আজ বৃহস্পতিবার জেনেভায় আলোচনায় বসছে, তবু সেখানে অচলাবস্থা কাটার সম্ভাবনা কম বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের অধিকাংশ রাজতন্ত্র তাদের ভূখণ্ডে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে অনীহা প্রকাশ করেছে। এমনকি যুক্তরাজ্যও ভারত মহাসাগরের চাগোস দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত ডিয়েগো গার্সিয়া সামরিক ঘাঁটি ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহারের অনুমতি দেবে না বলে জানা গেছে। ফলে সরাসরি ইরানে হামলা শুরু করা ওয়াশিংটনের জন্য জটিল হয়ে পড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরায়েল ও ভারতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। ইসরায়েলের সামনে বর্তমানে তিনটি লক্ষ্য রয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত—প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইরানে হামলা; দ্বিতীয়ত, ইরান-সমর্থিত প্রতিরোধ অক্ষকে দুর্বল করতে ইয়েমেন ও লেবাননে বড় ধরনের হামলা; এবং তৃতীয়ত, বহিরাগত আক্রমণের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার সমন্বয় ঘটানো।
ইরান যদি ইসরায়েলকে প্রতিহত করার চেষ্টা করে বা তেল আবিবসহ অন্য শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের দাবি, ইরানের ওপর হামলার ঘটনা ঘটলে ২০২৫ সালের জুন মাসের মতো এবার ভারত নিরপেক্ষ অবস্থান নেবে না। বরং ২০১৬ সালে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত লজিস্টিক এক্সচেঞ্জ মেমোরেন্ডাম অব এগ্রিমেন্ট (লেমোয়া) অনুযায়ী নয়াদিল্লি পদক্ষেপ নিতে পারে। এ চুক্তি অনুসারে দুই দেশ একে অপরের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার, জ্বালানি ও রসদ সরবরাহ এবং মেরামত সুবিধা নিতে পারে।
লেমোয়া চুক্তির বিরোধীরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, এর মাধ্যমে নয়াদিল্লিকে কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের অংশে পরিণত করা হয়েছে।
যুদ্ধ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়লে ভারতও এর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে না। জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি ভারতের ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করলে তা ভারত-ইরান সম্পর্ক এবং পশ্চিম এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।
মোদীর সফর ও ইরান ইস্যু
মোদীর ইসরায়েল সফরের অন্যতম লক্ষ্য ছিল তেল আবিবের নেতৃত্বাধীন ছয় দেশীয় এক অক্ষে যোগদান করা—এমন দাবি করা হচ্ছে। ইরানের নেতৃত্বাধীন প্রতিরোধ অক্ষ এবং যুক্তরাষ্ট্রঘনিষ্ঠ সৌদি আরব, মিশর ও তুরস্কের প্রভাব মোকাবিলায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এই অক্ষ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, এ অক্ষে ভারত ও ইসরায়েলের পাশাপাশি গ্রিস ও সাইপ্রাস রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরশাহিও এতে যোগ দিতে পারে। আফ্রিকার কয়েকটি দেশও যুক্ত হলে সৌদি আরব ও তুরস্কের জন্য তা অস্বস্তিকর হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তেহরানের কূটনৈতিক মহলে মনে করা হচ্ছে, এই অক্ষ সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে ভারতকে বাধ্য করবে। এমন ধারণাও রয়েছে যে, বড় মাপের আগ্রাসনের মাধ্যমে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বর্তমান সরকারকে সরিয়ে রেজা পেহলাবিকে ক্ষমতায় আনতে পারে। সে ক্ষেত্রে নতুন সরকারের আমলে ভারত তার পুরোনো বাণিজ্যিক ও কৌশলগত বিনিয়োগ—যেমন চাবাহার বন্দর—সুরক্ষিত করতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, মোদীর সফরকালেই যদি ইসরায়েল ইরানে হামলা চালায় এবং তেহরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে পাল্টা জবাব দেয়, তাহলে মোদীর ইসরায়েলে অবস্থান ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সে কারণে মোদী দেশে ফেরার আগে বড় ধরনের হামলা না হওয়ার সম্ভাবনার কথাও সামরিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন।
ভারত-আরব-ইরান সম্পর্কে প্রভাব
নয় বছর পর উত্তেজনাপূর্ণ এক সময়ে ইসরায়েল সফরে গেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। গাজায় দুই বছরব্যাপী অভিযানে শিশু ও নারীসহ ৭০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যুদ্ধবিরতির সময়েও হামলা অব্যাহত রয়েছে বলে বিভিন্ন মহল দাবি করছে। পশ্চিম তীরেও উত্তেজনা বজায় রয়েছে।
এ অবস্থায় ইসরায়েলের সংসদ নেসেটে মোদীর বক্তব্য আঞ্চলিক কূটনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা। ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক, প্রযুক্তিগত ও আদর্শিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ফলে পশ্চিম এশিয়া এবং বহুপাক্ষিক মঞ্চ—যেমন ব্রিকস বা সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা—এ ভারতের অবস্থান চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
ভারত একদিকে দক্ষিণ গোলার্ধের নেতৃত্বের দাবি করছে, অন্যদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা সেই অবস্থানকে জটিল করে তুলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের মত।
২০২৪ সালে রাশিয়া সফরে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাতে মোদী বলেছিলেন, “এটি যুদ্ধের যুগ নয়, আলোচনার।” তবে ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনায় সেই বক্তব্য পুনরাবৃত্তি না হওয়ায় সমালোচনাও রয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ইরান থেকে ভারতীয় নাগরিকদের সরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। বড় আকারে যুদ্ধ শুরু হলে এবং ইরান যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়, তাহলে ভারতীয় নাগরিকদের সরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, যদি ইরান ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মোকাবিলায় সফল হয়, তাহলে পশ্চিম এশিয়ার জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণে নয়াদিল্লিকে দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।


