ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিশ্বের অন্যান্য ৪২টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের মতনই দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনে যোগ দিতে জোহানেসবার্গে পৌঁছেছেন। তাঁর জোহানেসবার্গে যাওয়ার পিছনে বড় ভূমিকা পালন করেছে মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ আফ্রিকার জি-২০ সম্মেলন বয়কট করার সিদ্ধান্ত। গত আগস্ট মাসের শুরুতে, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির ভারতের রফতানির উপর ২৫% অতিরিক্ত শুল্ক চাপিয়ে দেওয়ার পর থেকে — যার ফলে ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানীকৃত পণ্যের উপর মোট শুল্ক ৫০% এ গিয়ে দাঁড়িয়েছে — মোদী সচেতন ভাবে ট্রাম্পের সাথে সরাসরি সাক্ষাত করার থেকে বিরত থেকেছেন। ওয়াশিংটনের সাথে নয়া দিল্লীর বাণিজ্য সম্পর্ক স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত, অর্থাৎ ভারতের রফতানির থেকে যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত শাস্তিমুলক শুল্ক না পরিহার করা পর্যন্ত মোদীর পক্ষে ট্রাম্পের সাথে মুখোমুখি সাক্ষাত করা তাঁর দেশের রাজনীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
Here are highlights from the welcome yesterday in Johannesburg…
— Narendra Modi (@narendramodi) November 22, 2025
Looking forward to taking part in the G20 Summit proceedings today. pic.twitter.com/kLbR7Srmg3
এ ছাড়াও ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন যে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে মে মাসের চার দিনের সংঘাত তিনি মধ্যস্থতা করে বন্ধ করিয়েছিলেন। এই দাবি পাকিস্তান সরকারি ভাবে মেনে নিলেও জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভাবমূর্তিতে ব্যাপক ক্ষতি হবে বলে মোদী বা তাঁর অতি-দক্ষিণপন্থী দল, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) স্বীকার করেনি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এবং জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর বিরোধী উদারপন্থী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও বামপন্থী দলগুলো মনে করে। এই কারণে বিগত দিনে মালয়েশিয়াতে অনুষ্ঠিত আসিয়ান গোষ্ঠীর সম্মেলনেও মোদী যাননি এবং ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করেন।
ট্রাম্প দক্ষিণ আফ্রিকার জি-২০ সম্মেলন বয়কট করার ফলে, এবং এই সম্মেলনে ব্রিকস গোষ্ঠীর অপর দুই রাষ্ট্র নেতা — রুশ রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং — না আসায়, মোদী নিজের জন্যে একটি সুবিধাজনক মঞ্চ পেয়েছেন যেখানে তিনি ভারতের সাথে একদিকে যেমন দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোর, বিশেষ করে আফ্রিকান ইউনিয়নের দেশগুলোর, অন্যদিকে ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক মজবুত করার প্রচেষ্টা করবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে যে কারণে মোদীর কাছে দক্ষিণ আফ্রিকার জি-২০ সম্মেলন খুবই জরুরী হয়ে উঠেছে তা হলো বিশ বাও পানিতে থাকা ভারত-মধ্য প্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর (আইমেক) প্রকল্পটি।
আইমেক প্রকল্পটির জন্ম হয় ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব সহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতাদের মিলিত বৈঠকে।
আইমেক প্রকল্প দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে ইউরোপীয় বাজারের সাথে যুক্ত করতে চায় ক্রমাগত অস্থির হতে থাকা ভারত মহাসাগর ও লোহিত সাগর কে এড়িয়ে।
ভারতের গুজরাট ও মহারাষ্ট্র রাজ্যের বন্দরগুলোর থেকে সমুদ্র পথে পণ্য, হাইড্রোজেন, ও তথ্যের লাইন পৌঁছাবে সংযুক্ত আমিরশাহিতে। সেখান থেকে রেল পথে—ও তার পাশাপাশি বিছিয়ে দেওয়া তারের মাধ্যমে—সৌদি আরব, জর্ডান, প্রভৃতি পেরিয়ে ইজরায়েল-অধিকৃত উত্তর ফিলিস্তিনের হাইফা বন্দর দিয়ে পণ্য, জ্বালানি গ্যাস ও তথ্য পৌঁছে যাবে ইউরোপের ইতালিতে।
তবে সেই বছরের অক্টোবর মাস থেকে ফিলিস্তিনের গাজায় ক্রমাগত আগ্রাসন শুরু করে ইজরায়েল, যে গণহত্যার চাকা ২০২৫ সালেও গড়িয়ে চলেছে। এর ফলে প্রকল্পের অংশীদার সৌদি আরব নিজের আঞ্চলিক প্রতিপত্তি ক্ষুন্ন হওয়ার ভয়ে প্রকল্পটি নিয়ে আর এগোয়নি। যদিও ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর ২০২৪-এর জাতিসঙ্ঘের সাধারণ অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে সৌদি আরব আর আমিরশাহির প্রশংসা করে সেই দেশগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে শুভ শক্তি বলে চিহ্নিত করেন ও আইমেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করার উপর জোর দেন, তবুও ঘটনাচক্রে আমিরশাহি রাজি থাকলেও সৌদি আরব বেঁকে বসে।
বর্তমানে সৌদি আরবের আইমেক বিরোধিতা শুধু যে ফিলিস্তিনের স্বার্থে করছে তা নয়, বিশেষজ্ঞদের মতে এটি যুবরাজ মহম্মদ বিন সালমানের একটি কৌশল পশ্চিমাদের সাথে দর কষাকষির জন্যে। এর ফল দেখা গিয়েছে হোয়াইট হাউজে ট্রাম্পের সাথে যুবরাজের বৈঠক ও তার পরে মার্কিন ও সৌদি চুক্তিগুলোর থেকে।
কিন্তু এই প্রকল্প থমকে থাকলে প্রভূত ক্ষতি হবে ভারতের মোদী সরকারের ও শাসক বিজেপির।
এর কারণ হলো আইমেক প্রকল্পের ফলে সবচেয়ে লাভবান হবেন ভারতের বন্দর থেকে বিদ্যুৎ সাম্রাজ্যের মালিক গৌতম আদানির গোষ্ঠী।
ভারতের গুজরাট রাজ্যের যে বন্দর — মুন্ধ্রা — থেকে আইমেক প্রকল্পের পণ্যের যাত্রা শুরু হবে তার মালিকানা যেমন আদানি গোষ্ঠীর, তেমনি অধিকৃত ফিলিস্তিনের উত্তরে অবস্থিত হাইফা বন্দরের মালিকানাও সেই একই গোষ্ঠীর। এর সাথে যে হাইড্রোজেন পাইপলাইন তৈরির কথা চলছে, সেই গ্যাসও আদানি গোষ্ঠী সরবাহ করবে বলে জানা যাচ্ছে।
ভারতের বিরোধী দলগুলো, বিশেষ করে ইন্ডিয়া জোটের সদস্য দলগুলোর বেশির ভাগই, অভিযোগ করে যে মোদী সরকার সমস্ত সিদ্ধান্ত আদানি ও আম্বানি (রিলায়েন্স) গোষ্ঠী গুলোর স্বার্থে নেয়। যদিও আইমেক প্রকল্পের পরিকল্পনা তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেনের প্রশাসন করেছিল চীনের বেল্ট এন্ড রোড (বিআরআই) প্রকল্পকে টেক্কা দিতে ও আগামী দিনে ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে উঠলেও যাতে জরুরী পণ্য, বিশেষত প্রযুক্তি শিল্পের জন্যে ব্যবহৃত উচ্চমানের চিপ, পরিবহন করতে কোনো সমস্যা না হয় এবং পশ্চিমা বিশ্বের কাছে যোগানের পথ বন্ধ না হয় সেই জন্যে, কিন্তু মোদী সরকারের কাছে বিজেপির ঘনিষ্ঠ দুই বৃহৎ কর্পোরেট সংস্থাকে এই প্রকল্পের থেকে লাভবান করার সুযোগ তৈরি হয়।
গত কয়েক বছর ধরে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় ফিরেই, মোদী জি-৭ গোষ্ঠীর সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন এই প্রকল্পটিকে ঠেলে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বার্থে।
যদিও মোদী ও বিজেপির আশা ছিল যে ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই ভারতের সাথে আদর্শগত কারণে ঘনিষ্ঠ হয়ে কাজ করবেন, কিন্তু সেই আশা গুড়ে বালি হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের ভারতের উপর শাস্তি মুলক শুল্ক চাপানো, বাংলাদেশ, পাকিস্তানের উপর তুলনামুলক ভাবে অনেক কম শুল্ক চাপানো, পাকিস্তানের সাথে দহরম মহরম ও চীনের সাথে সমস্ত গরম গরম বুলি আউরে শেষে বন্ধুত্ত্ব করতে বাধ্য হওয়া ভারত কে চাপে ফেলেছে।
অতিরিক্ত শুল্কের চাপে ভারতের রপ্তানিকারকেরা চূড়ান্ত অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছেন কারণ প্রথমত যুক্তরাষ্ট্র চিরকালই ভারতের রফতানির জন্যে সবচেয়ে বড় এবং লাভজনক বাজার ছিল, এবং দ্বিতীয়ত, ভারতের থেকে তুলনামুলক ভাবে অনেক কম শুল্কের বোঝা থাকায় ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ থেকে শুরু করে চীন এই সুযোগে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অনেক এগিয়ে যাবে, যা বিদেশী মুদ্রা আয়ের উপর প্রভাব ফেলবে।
যেহেতু চীন প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ভারতের থেকে অনেক এগিয়ে, এবং চীনের প্রযুক্তির উপর, দুর্লভ সমস্ত খনিজের উপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি শিল্পকে নির্ভর করতে হয়, তাই বেইজিং খুব সহজেই দরকষাকষি করে ট্রাম্প কে বাগে আনতে সক্ষম হয়েছিল শুল্ক যুদ্ধ চলাকালীন।
কিন্তু ভারতের কাছে তেমন দরকষাকষির কোনো অস্ত্র নেই। ভারত যে যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ইন্ডো প্যাসিফিক রণাঙ্গনে, চীনের বিরুদ্ধে সামরিক জোটের একটি স্থানীয় অংশ ছাড়া আর কিছুই নয়, সেটা ট্রাম্প প্রকাশ করেছেন।
ফলে বাধ্য হয়ে, ট্রাম্পের সাথে সামাজিক মাধ্যমে সৌজন্য বজায় রেখেও, একটি বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত তাঁর থেকে দুরত্ব বজায় রেখেছেন মোদী।
এ ছাড়াও ভারত নিজের রফতানির জন্যে হন্যে হয়ে নতুন বাজার খুঁজছে। নতুন বাণিজ্য চুক্তি করার চেষ্টা করছে অন্যান্য শক্তির সাথে।
একদিকে মোদী চীনের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উপর জোর দিয়েছেন, রাশিয়ার সাথে রণনৈতিক অংশীদারিত্বের পথে এগিয়েছেন এবং যুক্তরাজ্যের পরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথেও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার চেষ্টা করছে।
তাই এবারের দক্ষিণ আফ্রিকার জি-২০ সম্মেলনেও মোদী খুব চাপে পড়েই সবাইকে আলিঙ্গন করবেন, অনেক কথা বলবেন আর চেষ্টা করবেন নতুন বাজার খোঁজার। কিন্তু এই সম্মেলনে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী কোনো বাজার বা সুরাহা খুঁজে পাবেন কি না সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।



