Close

জি-৭ গোষ্ঠীর শীর্ষ সম্মেলনে উপস্থিত না থেকেও দাপিয়ে গেল রাশিয়া ও চীন

জি-৭ গোষ্ঠীর শীর্ষ সম্মেলনে উপস্থিত না থেকেও চীন আর রাশিয়া এই বৈঠকে নিজেদের দাপট বজায় রেখেছে। আর এদের রোখার নানা ফন্দি করলো সাতটি দেশ মিলে।

জি-৭ গোষ্ঠীর শীর্ষ সম্মেলনে উপস্থিত না থেকেও দাপিয়ে গেল রাশিয়া ও চীন

জি-৭ গোষ্ঠীর শীর্ষ সম্মেলনে

সম্প্রতি শেষ হওয়া জি-৭ গোষ্ঠীর শীর্ষ সম্মেলনে উপস্থিত না থেকেও দাপিয়ে গেল রাশিয়াচীন। বিশ্বের পূর্বতন শক্তিমান সাতটি অর্থনৈতিক শক্তি—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান, ফ্রান্স, ইতালি, ও কানাডা—যারা আজ ক্ষয়িংশু ও সঙ্কটে নিম্মজিত, জাপানের হিরোশিমা শহরে বসে আলোচনা চালিয়ে গেল কী ভাবে দুটি উদীয়মান শক্তিকে, ও তাদের সাথে হাত মিলিয়ে একটি বহুমেরুর বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আগ্রহী বাকি বিশ্বের অসংখ্য দেশের প্রয়াস কে রোখা যায়।

জি-৭ গোষ্ঠীর শীর্ষ সম্মেলনে আলোচিত বিষয়বস্তুর বেশির ভাগ জুড়েই ছিল রাশিয়া ও চীনকে রোখার ফন্দি। প্রথমত, ইউক্রেনে রাশিয়ার চলমান বিশেষ সামরিক অভিযান কে আটকাতে বারবার ব্যর্থ হয়েও হাল ছাড়তে নারাজ পশ্চিমারা। তাই তারা আবার ৩০০টি লক্ষ্যবস্তুর উপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছে এই বলে যে এর ফলে রাশিয়ার সামগ্রিক ভাবে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়া আটকানো যাবে, রুশ তেল বিক্রির থেকে আয় করা অর্থ যুদ্ধে ব্যয় হওয়া থামানো যাবে, ও রুশ সামরিক শিল্পের যোগানের পথে বাধা সৃষ্টি করা যাবে।

অথচ, গত ১৫ মাসের হিসাব বলছে রাশিয়ার উপর চাপানো সমস্ত নিষেধাজ্ঞা ব্যুমেরাং হয়ে পাল্টা আঘাত হেনেছে পশ্চিমাদের উপর। ইউরোপের অর্থনীতি সঙ্কটে, জ্বালানি সঙ্কটে কাহিল ইউরোপবাসী। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থাও ফুসফুসে ক্যান্সারের চতুর্থ পর্যায়ে থেকেও ধূমপান করে যাওয়া রোগীর মতন।

দ্বিতীয়ত, মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন জানান যে ইউক্রেনের সামরিক পাইলটদের এফ-১৬ বিমানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এই ঘোষণা তিনি তখন করেন যখন ফরাসি রাষ্ট্রপতির থেকে ধার করা একটা বিমানে চেপে হঠাৎ ইউক্রেনের সঙ্কটগ্রস্ত রাষ্ট্রপ্রধান ভোলোদিমীর জেলেনস্কি হিরোশিমায় হাজির হন, সৌদি আরব থেকে। এই ঘোষণাকে জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শোলৎস স্বাগত জানান। শোলৎস বলেন যে এর ফলে রাশিয়ার সামরিক অভিযান আর আগের মতন অগ্রসর হতে পারবে না। কিন্তু এখানে ঘটনা হল যে জেলেন্সকি সরকারের সামরিক পাইলটদের এফ-১৬ চালাতে শেখালেও সেই জঙ্গী বিমান কোনো ভাবেই এই মুহূর্তে ইউক্রেনের হাতে ওয়াশিংটন তুলে দেবে না।

একটি মার্কিন সামরিক ম্যাগাজিন দাবি করেছে যে ইউক্রেন কে এই জঙ্গী বিমান না দেওয়ার পিছনে আছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শিল্পের চাপ। যুক্তরাষ্ট্র তার জঙ্গী বিমানের বিজ্ঞাপন করে তাদের অপ্রতিরোধ্য হিসাবে দেখিয়ে। তবে ঘটনা হল গত সাত দশকে কখনোই যুক্তরাষ্টের বিমান বাহিনী কে অন্য বিমান বাহিনীর মুখোমুখি হতে হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র কায়দা করে সেই দেশগুলোতেই বেশি হামলা করেছে যে দেশের হয় বিমান বাহিনী ছিল না, বা অতিশয় দুর্বল ছিল। কিন্তু রাশিয়ার বিমান বাহিনীর সাথে আকাশ যুদ্ধে ঘায়েল হয়ে এফ-১৬ বিমান ধ্বংস হলে, বা রুশ গোলাবর্ষণের ফলে বিমান ঘাঁটিতে তা জ্বলে পুড়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের মুখই শুধু পুড়বে না, বরং তার সামরিক ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে ও তার সামরিক ব্যবসা মার খাবে।

তৃতীয়ত, জি-৭ গোষ্ঠীর শীর্ষ সম্মেলনে আলোচিত হয় কী ভাবে ভারত, ব্রাজিল, ও উদীয়মান দক্ষিণ গোলার্ধের শক্তিগুলোকে রাশিয়া ও চীনের বিরুদ্ধে নিয়ে যাওয়া যায়। তাই এবার এই দেশগুলোর রাষ্ট্রনায়কদের নিমন্ত্রণ জানায় জি-৭ গোষ্ঠী। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই বৈঠকে অংশ নেন। এবং সেখানে তাঁর সাথে জেলেনস্কির আধ ঘন্টা বৈঠকের ব্যবস্থা করে বৃহৎ শক্তিগুলো। তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যম কে জানান যে এই গোষ্ঠী চায় ভারত, ব্রাজিলের মতন দেশগুলো ইউক্রেনের পক্ষ অবলম্বন করুক ও রাশিয়ার সংশ্রব ত্যাগ করুক। কিন্তু সেখানেও সামগ্রিক ভাবে সফল হয়নি পশ্চিমা শক্তিগুলো। 

ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী যে নিরপেক্ষ থাকার নীতি নিয়েছেন তার থেকে তিনি জেলেন্সকির সাথে তাঁর যুদ্ধ শুরুর পরে হওয়া প্রথম বৈঠকেও সরে আসেননি। মোদী জেলেন্সকি কে দ্ব্যর্থহীন ভাবে জানান যে ভারত ইউক্রেন কে মানবিক ভাবে ত্রাণ দিয়ে যেমন সমর্থন করতে থাকবে তেমনি যুদ্ধ থামানোর ও আলোচনার মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যে যা যা প্রয়োজন তা নিজের সাধ্যমত করবে। এবং এই বৈঠকে বা তার পরে মোদী কোনো ভাবেই রাশিয়ার বিশেষ সামরিক অভিযান কে সমালোচনা করেননি, বা মস্কোর বিরুদ্ধে চাপানো সব নিষেধাজ্ঞা সমর্থনও করেননি। এই খেলায় পশ্চিমা শক্তিগুলোর ফাঁদে অন্য কোনো দক্ষিণ গোলার্ধের দেশ পড়েওনি।

শেষত, জি-৭ গোষ্ঠীর শীর্ষ সম্মেলনে চীন কে আটকানোর জন্যে অনেক শলাপরামর্শ হলেও, যুক্তরাজ্য বাদে ইউরোপের অন্য সদস্য দেশগুলো, যেমন জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালি কিন্তু জানায়নি যে তারা বারবার চীনে বাণিজ্য, লগ্নি ও প্রযুক্তির জন্যে যেহেতু ঢু মারছে, তাই তাদের পক্ষে যুক্তরাষ্টের প্রস্তাব মতন সার্বিক ভাবে চীন বিরোধিতার পথে চলা সম্ভব নয়। আর্থিক ভাবে সঙ্কটগ্রস্ত যুক্তরাষ্ট্র নিজের ঋণ নেওয়ার সীমা যদি ১লা জুন এর আগে না বাড়াতে পারে তাহলে মার্কিন অর্থনীতি আর সরকার যেমন ধ্বসে যাবে তেমনি বিশ্ব অর্থনীতি ধাক্কা খাবে। ফলে কোনো ভাবেই ইউরোপের খড় কুটো ধরে ভাসতে থাকা দেশগুলোর প্রধানরা বৃদ্ধ বাইডেনের ভিমরতি কে আস্কারা দিতে চাননি।

এর মধ্যেই চীনা বিদেশমন্ত্রক কড়া ভাষায় জি-৭ গোষ্ঠীর শীর্ষ সম্মেলনে চীনের ঘাড়ে নিষেধাজ্ঞা চাপানোর ও চীন কে বিশ্বে একঘরে করে দেওয়ার পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র আর যুক্তরাজ্যের চাপে হঠকারী কিছু করার থেকে স্বাভাবিক ভাবেই বিরত থাকবে বাকি সদস্য দেশগুলো।

চার দেশের চীন-বিরোধী সামরিক জোট কোয়াডের শীর্ষ বৈঠক আগেই মার্কিন অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে অস্ট্রেলিয়া বাতিল করে দেয়। সেই বৈঠক তাই জি-৭ গোষ্ঠীর শীর্ষ বৈঠকের মাঝেই সারতে হয়েছে কোয়াড সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়া কে। মূলতঃ ভারতের সাথে চীনের দ্বৈরথ কে কেন্দ্র করে নানা ভাবে নয়া দিল্লীকে নিজের “ইন্দো-প্যাসিফিক” অঞ্চলের লেঠেল হিসাবে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে চাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা কিন্তু ধাক্কা খায় যখন ভারতেরই চাপে এই কোয়াড বৈঠকের কোনো প্রস্তাবেই চীনের নাম উল্লেখ্য করা হয় না।

চীনের সাথে ভারতের সীমানা সংঘর্ষ হওয়ার পরেও দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বেড়েছে। ভারতের সাথে চীনের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সব চেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায় ২০২২ সালে। এর মধ্যে ভারত চীনের সাথে সীমানায় উত্তেজনা প্রশমনের জন্যে লাগাতার বৈঠক করে চলেছে এবং একমাত্র বিবৃতি ছাড়া চীনের সাথে কোনো লড়াইয়ে ভারত জড়াতে চায় না। ফলে কোয়াড আর “ইন্দো-প্যাসিফিক” রণমঞ্চ নিয়ে ভারত চীন কে চাপে রাখতে ও নিজের পাল্লা ভারী করতে নানা ধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিলেও, মার্কিন উস্কানিতে চীনের সাথে সংঘাতে জড়াবে না।

তবুও যুক্তরাষ্ট্র চায় আরো সংঘাত, আরো বেশি করে যুদ্ধ যাতে তার অর্থনীতি কে চাঙ্গা করা যায় এবং রুশ ও চীনের মতন দেশগুলো যে বহুমেরুর বিশ্ব গড়ার কথা বলছে, যে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা গড়ার কথা বলছে তাকে যেন আটকানো যায়। তাই যে হিরোশিমা শহর কে বিশ্বের প্রথম পরমাণু বোমা মেরে ধ্বংস করে দিয়ে নিজেকে বিশ্বের প্রধান সামরিক শক্তি হিসাবে চিহ্নিত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, ভাগ্যের পরিহাসে প্রায় আট দশক পরে সেই শহরে বসে তার ঘটি না ডোবা তালপুকুরের মান বাঁচাতে অনেক বেশি যুদ্ধের, অনেক বেশি রক্ত ক্ষয়ের আর অনেক বেশি মানুষের মৃত্যুর ওকালতি করে গেল তার সেই রাষ্ট্রপতি যাঁর মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। দেখার কথা এই জি-৭ গোষ্ঠীর শীর্ষ সম্মেলনে হওয়া আলোচনা আদেও কোনোদিন ফলপ্রসূ হবে নাকি রাশিয়া আর চীনের হাত কে আরও শক্তিশালী করবে।

Leave a comment
scroll to top