Close

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি: সার্বভৌমত্বের মূল্যে বাজার প্রাপ্তি

বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে শুল্ক ছাড়ের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। কিন্তু চুক্তির সূক্ষ্ম শর্তগুলো ঢাকাকে চীন, রাশিয়া ও অন্যান্য "অ-বাজার অর্থনীতি"র সঙ্গে সম্পর্ক রাখার এখতিয়ার থেকে কার্যত বঞ্চিত করছে। রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পে রাশিয়ার ভূমিকা, চীনা বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং বিএনপির "সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব" নীতি — সবই এখন একটি প্রশ্নের মুখোমুখি।

বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তিতে শুল্ক ছাড় মিলছে ঠিকই — কিন্তু চীন, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক রাখার স্বাধীনতা এখন প্রশ্নের মুখে।

বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের মাথার ওপর ঝুলছে ৩৭ শতাংশ শুল্কের খাঁড়া। শর্ত একটাই — আসন্ন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টি (বিএনপি) সরকার যদি যুক্তরাষ্ট্রের ভাষায় কোনো “অ-বাজার অর্থনীতি”র সঙ্গে নতুন কোনো বাণিজ্য চুক্তি করে, তাহলেই এই শুল্ক কার্যকর হবে। বিনিময়ে বাংলাদেশ পাচ্ছে শর্তাধীন শুল্ক ছাড় আর মার্কিন বাজারে প্রবেশের সুযোগ। কিন্তু হারাচ্ছে নিজের কূটনৈতিক স্বাধীনতা, নীতি নির্ধারণের এখতিয়ার। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পাদিত বাণিজ্য চুক্তির সারমর্ম এটাই — এবং এটি দক্ষিণ এশিয়ার দেশটির সার্বভৌমত্বের জন্যে অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

চীনের দিকে দরজা বন্ধ

নতুন বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি কার্যত দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক ক্ষেত্রে ঢাকার হাত-পা বেঁধে দিয়েছে। চীন বা রাশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে যেকোনো ধরনের বাণিজ্য সমঝোতায় যেতে চাইলে ওয়াশিংটন শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করতে পারবে। বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা এ বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি, কিন্তু বাস্তবতা স্পষ্ট — এই চুক্তি ঢাকার জন্য ওই দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পথ কার্যত রুদ্ধ করে দিয়েছে।

চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যদি কোনো “অ-বাজার অর্থনীতি”র সঙ্গে চুক্তি করে এবং তা আমেরিকার স্বার্থহানি করে, তাহলে ওয়াশিংটন পুরো চুক্তি বাতিল করতে পারবে এবং গত ২ এপ্রিল ২০২৫-এর নির্বাহী আদেশ ১৪২৫৭ অনুযায়ী পারস্পরিক শুল্কহার পুনরুদ্ধার করতে পারবে।

এই বিধিনিষেধ আরেকটি বড় স্বপ্নকেও ধুলোয় মিলিয়ে দিতে পারে। বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্য জোট আঞ্চলিক ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে বা আরসিইপি-তে যোগ দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের। চীন এই জোটের সদস্য এবং তাই বাংলাদেশের এই জোটে যোগ দিতে হলে প্রতিটি সদস্যদেশের সঙ্গে আলাদা চুক্তি করতে হবে, যা এই মার্কিন বিধিনিষেধের আওতায় পড়তে পারে।

বেইজিংয়ের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপরেও এই চুক্তি প্রশ্নচিহ্ন ঝুলিয়ে দিয়েছে। এর পরিণতিতে বাংলাদেশের প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা খাতে উচ্চাভিলাষ ব্যাহত হবে এবং ঢাকা একটি সংকীর্ণ অক্ষের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে — শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিমা মিত্র এবং আঞ্চলিক প্রভু ভারতের দিকে মুখ চেয়ে থাকতে হবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন যেসব দেশকে “অ-বাজার অর্থনীতি” হিসেবে চিহ্নিত করে রেখেছে, তার মধ্যে রয়েছে চীন, রাশিয়া, ভিয়েতনাম, বেলারুশ, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, মলদোভা এবং আজারবাইজান।

বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে “সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে শত্রুতা নয়” — এই স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির কথা বলে আসছে। কিন্তু মার্কিন চুক্তির এই শর্তগুলো সেই নীতিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে মারাত্মক বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

রাশিয়া সম্পর্ক ও জ্বালানি খাতে ধাক্কা

চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, ফুয়েল রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কেনা যাবে না — তবে বিকল্প সরবরাহকারী না থাকলে বা চুক্তিটি আগে থেকে সম্পাদিত হলে ব্যতিক্রম মানা হবে।

এই বিধান রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলতে পারে। রাশিয়ার সঙ্গে নতুন সরবরাহ বা সেবা চুক্তিতে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। মূলত, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উপর ওয়াশিংটনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা পাবে। এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, ভারতের সঙ্গে অসম চুক্তির মাধ্যমে সার্বভৌমত্ব বন্ধক রাখার অভিযোগে শেখ হাসিনাআওয়ামী লীগ সরকারকে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল। এইবার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এহেন চুক্তি বাস্তবায়ন করলে কি বিএনপিও জনরোষে পড়বে?

বিনিয়োগে হুমকি

বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও চুক্তির হাত অনেক লম্বা। কোনো তৃতীয় দেশের কোম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে যদি যুক্তরাষ্ট্রে বাজারমূল্যের নিচে পণ্য রপ্তানি করে, তাহলে ওয়াশিংটন সেই কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে।

এই শর্তটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সরাসরি হুমকি। চীনা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার পথ এখন কার্যত বন্ধ। মনে রাখতে হবে, গত মার্চ ২০২৫-এ বেইজিং সফরে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস চীনের বৃহদাকার বিনিয়োগের জন্য দরজা খুলে দিয়েছিলেন। ধারণা করা হচ্ছিল, মার্কিন শুল্ক এবং ইউরোপীয় বাধা এড়াতে চীন বাংলাদেশকে উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

চুক্তির প্রসার আরও ব্যাপক। কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে অন্য কোথাও বাজারমূল্যের নিচে পণ্য বিক্রি করলে এবং এতে কোনো মার্কিন কোম্পানি ক্ষতিগ্রস্ত হলে, ওয়াশিংটন হস্তক্ষেপ করতে পারবে।

এই ধারার কারণে চীনসহ অন্যান্য বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখন বাংলাদেশে বিনিয়োগে দ্বিধান্বিত হবে। এর প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে। অনেক চীনা কোম্পানি বাংলাদেশকে কম খরচে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছিল — সেই পরিকল্পনা এখন ভেস্তে যেতে পারে।

ঔপনিবেশিক আদলে অসম চুক্তি

চুক্তির ছত্রে ছত্রে অসাম্যের চিত্র স্পষ্ট। “বাজারমূল্য” কী হবে তা নির্ধারণের একচেটিয়া অধিকার যুক্তরাষ্ট্রের। ঢাকার সেই ক্ষমতা নেই। উল্টোদিকে, যুক্তরাষ্ট্র অন্যদের সঙ্গে যেকোনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করতে পারবে, কিন্তু ঢাকা তা পারবে না।

১৯৯০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ডাম্পিং-বিরোধী শুল্ক আরোপ করেছিল। সেবার উৎপাদন খরচের সঙ্গে ২০ শতাংশ মুনাফা যোগ করে বাজারমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই দুঃস্বপ্ন এখন আরও বড় আকারে ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার চুক্তিটিকে জয় হিসেবে উপস্থাপন করছে, কিন্তু সূক্ষ্মাক্ষরে পড়লে বোঝা যায়, ঢাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামনে কার্যত নিষ্ক্রিয়। 

চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ ১,৬৩৮টি পণ্যে শুল্ক ছাড় পাবে। বিনিময়ে দিতে হবে ৬,৭১০টি মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক হ্রাস। মার্কিন পণ্যে বাংলাদেশ শুল্ক কমাচ্ছে ৫০ শতাংশ — কাস্টমস, সম্পূরক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক সবকিছু মিলিয়ে। শুধু ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর অপরিবর্তিত থাকবে। ফলে সরকারের রাজস্ব কমবে, দেশীয় শিল্প আরও কড়া প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে এবং কৃষি খাতে সংকট বাড়তে পারে।

মেধাস্বত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে ডব্লিউটিও কাঠামোর বাইরে আরও ১৩টি চুক্তিতে সই করতে হবে বাংলাদেশকে। সেই মান পূরণে দেশীয় আইন ও শিল্পকে মানিয়ে নেওয়া সহজ হবে না।

বৃহত্তর চিত্রটি উপেক্ষার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ মার্কিন বাজারে প্রবেশ পাচ্ছে ঠিকই — কিন্তু কী মূল্যে? কার সঙ্গে বাণিজ্য করবে, কী কিনবে, কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে — সবকিছুতেই শর্তের শৃঙ্খল। শুল্ক ছাড়ের গাজরের পেছনে কৌশলগত লাঠিটি বড্ড লম্বা।

তৈরি পোশাকে শূন্য শুল্ক — তবে শর্তে

অন্তর্বর্তী সরকার যে একটিমাত্র সাফল্যের কথা জোর দিয়ে বলছে, তা হলো কিছু তৈরি পোশাকে শূন্য শুল্ক। কিন্তু সেখানেও কড়া শর্ত — পোশাক তৈরিতে বাংলাদেশকে মার্কিন তুলা ও সুতা ব্যবহার করতে হবে, যা ভারত বা পাকিস্তান থেকে আনা কাঁচামালের চেয়ে অনেক বেশি দামি। ফলে রপ্তানিকারকদের মুনাফা কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

নব্য-ঔপনিবেশিক কাঠামো এখানে একেবারে বেনকায়দায় দৃশ্যমান।

এখন প্রশ্ন হলো, ইউনূস এই চুক্তি চূড়ান্ত করে বিদায় নেওয়ার পর, আসন্ন বিএনপি সরকার এই চুক্তি অনুমোদন করবে, নাকি “বাংলাদেশ প্রথম” পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে পুনরায় আলোচনার পথ বেছে নেবে। উত্তর মিলবে সময়ের হাতে।

কিন্তু এই মুহূর্তে যেটা দৃশ্যমান সেটা হলো অতি-ডান ইসলামী শক্তিগুলো যে ব্যাপক ভাবে ভারতের ঔপনিবেশিক শাসনের অভিযোগ তুলে হাসিনা সরকারের পতন কার্যকর করেছিল, তারা কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব কে বন্ধক রাখার বিষয়ে নীরবতা পালন করছে।

ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কী হবে এই নিয়ে সংবাদ মাধ্যম থেকে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা চললেও অন্তর্বর্তী সরকারের চাপিয়ে দেওয়া এই বিতর্কিত চুক্তি নিয়ে কোনো আলোচনা নেই।

আর এই ফাঁকেই দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন একের পর এক প্রাক্তন উপদেষ্টা। 

তাহলে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তির পরে কোন পথে হাঁটবে বিএনপির আমলে, সেটাই এখন দ্রষ্টব্য। 

Leave a comment
scroll to top