১২ ফেব্রুয়ারি ভারতের প্রায় তিন কোটি শ্রমিক ধর্মঘট করেন। তাঁরা কাজে হাত দেননি। নানা রাজ্যে কল-কারখানার গেটে তালা ছিল, রাস্তায় মিছিল হয়েছে। ভারতের শ্রমিকদের ধর্মঘটে যোগ দিয়েছেন কৃষক সংগঠনগুলো। শ্রমিক নেতারা বলছেন—এটা শ্রমিক অধিকার সুরক্ষার লড়াই। এটি ভারতের একটি অন্যন্য ধর্মঘট যেখানে শ্রমজীবী মানুষ সরাসরি সংঘাতে নেমেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের শ্রম নীতি, কৃষি নীতি ও পশ্চিমা-ঘেঁষা বিদেশ নীতির বিরুদ্ধে এক সাথে।
ভারতের দশটিরও বেশি কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন, অতি-ডানপন্থী ভারতীয় মজদুর সঙ্ঘ বাদে, এই ধর্মঘটে যোগ দিয়েছে। সরকারি খাত ও সংগঠিত শিল্পে সাড়া পড়েছে জোরালোভাবে। কিন্তু মোদীর অতি-ডানপন্থী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-শাসিত রাজ্যগুলোতে ধর্মঘটের সাড়া ছিল হতাশাজনকভাবে কম। তেমন প্রভাব অসংগঠিত ক্ষেত্রেও পড়েনি।
শ্রমিক নেতারা বলছেন, মোদীর বিজেপি সরকার গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাতের শ্রমিকদের সুরক্ষা দিত যে আইনগুলো, সেগুলো বাতিল করে দিয়েছে। এর বদলে যে চারটি শ্রম কোড চালু হয়েছে তাতে শ্রমিকদের সকল অধিকার হরণ করে তাঁদের দাস-শ্রমিকে পরিণত করা হবে।
এর সাথেই বিজেপি মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান গ্যারান্টি আইন—সংক্ষেপে মনরেগা—দুর্বল করেছে। এর ফলে গ্রামের ভূমিহীন কৃষকদের, কৃষি শ্রমিকদের কাজের সুযোগ কমে যাচ্ছে এবং আগামী দিনে অসংখ্য মানুষ পরিযায়ী হতে বাধ্য হবেন।
এই কারণেই কৃষকদের বৃহৎ সংগঠন সংযুক্ত কিষান মোর্চাও এই ধর্মঘটে সমর্থন জানিয়েছে। কৃষক আর শ্রমিক—দুই শ্রেণি এক মঞ্চে। তাদের এক অভিযোগ মোদীর বিজেপির নেতৃত্বাধীন ইউনিয়ন সরকার ‘জনবিরোধী’ ও ‘কর্পোরেট-তোষণকারী’ নীতির পথে হাঁটছে।
কিন্তু এই শ্রম আইন ও গ্রামীণ সঙ্কট নিয়েই শুধু এই ধর্মঘট সংগঠিত হয়নি। এর পাশাপাশি চলমান বাণিজ্য আলোচনায় কৃষি খাতকে মার্কিন বাজারের কাছে খুলে দেওয়ার পরিকল্পনারও তারা বিরোধিতা করছেন। এই প্রথম শ্রমিক ও কৃষক সংগঠনগুলো সরাসরি ভারতের বিদেশনীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছেন।
কিন্তু সেই লড়াই ছাপিয়ে উঠে এসেছে আরও গভীর এক প্রশ্ন—মোদী সরকারের নতুন বাণিজ্য চুক্তিগুলো—ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে—কি ভারতের শ্রমজীবী মানুষের গলায় ফাঁস বাঁধছে? সম্ভবত প্রথমবারের মতো, বৈদেশিক বাণিজ্যনীতি আর কারখানার মেঝে একই রাস্তায় মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। আর এখানেই প্রকট হচ্ছে বৈদেশিক বাণিজ্য চুক্তিগুলোর মধ্যেকার সমস্যার জায়গাগুলো।
বাণিজ্যের চাপে ভারতের শ্রম আইন
ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে (এফটিএ) শ্রম আইনের কথা লেখা আছে—কাগজে-কলমে। ব্রাসেলস দাবি করছে, চুক্তিতে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মূলনীতিগুলো মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে: সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা, সমষ্টিগত দর-কষাকষির অধিকার, জোরপূর্বক শ্রম বন্ধ, শিশুশ্রম নির্মূল, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যহীনতা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ—এই বিষয়গুলো চুক্তিতে স্থান পেয়েছে।
ইইউ আরও বলছে, ন্যায্য কর্মপরিবেশ, শ্রম পরিদর্শন, সামাজিক সংলাপ ও দায়িত্বশীল ব্যবসার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি রয়েছে। ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকরা এই ধারাগুলোকে ‘মূল্যবোধভিত্তিক বাণিজ্য’র কাঠামো হিসেবে তুলে ধরতে চান।
কিন্তু ভারতের ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা এই মিষ্টি কথায় বিশ্বাস করেন না। মোদী সরকার যখন শ্রম আইনগুলোকে বিলুপ্ত করে কর্পোরেট-বান্ধব শ্রম কোড চালু করছে, তখন তাঁদের কাছে শ্রম অধিকারের এই ধারাগুলো স্রেফ ছাপার অক্ষরে থাকা একটা ছাঁচ—যা প্রয়োগের কোনো সদিচ্ছা নেই।
শ্রমিক নেতারা বলছেন, ঢাকঢোল পিটিয়ে লঙ্ঘন না ঘটলে নয়াদিল্লি আইএলও মানদণ্ড মেনে চলার কোনো চাপ অনুভব করবে না, ইইউও কোনো গুরুতর তদন্তে নামবে না।
সেন্টার অব ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়নস (সিটু)-এর সর্বভারতীয় সভাপতি সুদীপ দত্ত ‘ইস্ট পোস্ট’-কে বললেন, “প্রথম কথা হলো আই এল ও-এর কোর কনভেনশন, যেগুলো ভারত সই করেছে, সেগুলোও ভারতের ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যতামূলক বা বাইন্ডিং কনভেনশন নয়। দ্বিতীয় কথা যেকোনো শ্রম সংক্রান্ত কনভেনশন লাগু করার ফান্ডামেন্টাল শর্ত হলো সংগঠিত হওয়ার অধিকার আর কালেকটিভ বার্গেনিং (যৌথ দর কষাকষি) এর অধিকার নিশ্চিত হওয়া। ভারত দেশ হিসেবে আইএলও-এর এই দুটো কনভেনশনকেই মান্যতা দেয় না। তৃতীয়ত, যদি কোনো আইনগত ধারণা মেনেও নেওয়া হয়, সবচেয়ে বড় বিষয় হলো তার লাগু করার মেকানিজম। ভারতে চালু বাধ্যতামূলক শ্রম আইন লাগু করারই কোনো মেকানিজম নেই—গোটা দেশের শ্রমিক সংখ্যার তুলনায় লেবার ইন্সপেক্টর, লেবার অফিস, লেবার কোর্ট নগণ্য।”
দত্ত আরও যোগ করেন: “আরেকটি বিষয় হলো বিরাট সংখ্যার ইনফরমাল শ্রমিক, যারা বস্ত্র, বয়ন বা চামড়া শিল্পের সাথে যুক্ত আছেন, তাদের ব্যাপারে লেবার স্ট্যান্ডার্ড লাগু করার কোনো মেকানিজম নেই। আর সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি—সরকার মনে করে শ্রম সংক্রান্ত বিধিনিষেধে খোলা ছাড় দিতে পারলেই একমাত্র পুঁজির বিনিয়োগ নিশ্চিত করা যাবে। সেক্ষেত্রে চালু শ্রম আইনকে দাঁত-নখহীন করে ফেলার জন্য লেবার কোড লাগু করা হচ্ছে।”
অল ইন্ডিয়া কোঅর্ডিনেশন কমিটি অব ট্রেড ইউনিয়নসের (একটু) অঞ্জন চক্রবর্তীও একই সুরে কথা বললেন: “ভারত-ইইউ র মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পথে দেশের শ্রম কোড কোন বাধা হবে না। আই এল ও-র labour standards এর সাথে comply না করলেও, বাস্তব এটাই যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। আই এল ও র দুটো core conventions, 87 (Freedom of Association) ও 98 (Right of Collective Bargaining) ভারত সরকার ratify করেনি। এটা EU জেনে বুঝেই স্বাক্ষর করেছে।”
চক্রবর্তী ‘ইস্ট পোস্ট’-কে আরও জানালেন: “ভারত-ইইউ র বাণিজ্য চুক্তিতে আই এল ও কনভেনশন বাধ্যতামূলক নয়। Core labour standards লঙ্ঘন হলে শাস্তির ব্যবস্থা নেই। Corporate দের অধিকার enforceable, শ্রমিকদের নয়। এটাই আসল ভারসাম্যহীনতা।”
ইইউর বলবৎকরণ ক্ষমতা নিয়ে ট্রেড ইউনিয়নের সংশয়
ইউনাইটেড ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের (ইউটিইউসি) দীপক সাহা শ্রম আইনের ধারাগুলোকে নিছক সাজসজ্জা বলে উড়িয়ে দিলেন। তাঁর মতে ইইউ এই ধারা বলবৎ করতে পারবে না।
“ভারত শ্রমিকদের অধিকার ধ্বংস করে দিচ্ছে, এবং মনে হচ্ছে ফ্যাসিস্ট শাসন চলছে। শ্রমিক শ্রেণিকে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো সামাজিক নিরাপত্তা নেই, কাজই নেই। সরকার খাদ্য নিরাপত্তাও কেড়ে নিয়েছে—মানুষকে চরম হতাশার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। মানুষ কাজ খুঁজছে। এমন শ্রমিকও আছে যারা মাত্র ১০০ টাকার জন্য কাজ খুঁজছে—এতটাই নিদারুণ অবস্থা। মনরেগা মেরে ফেলা হয়েছে। একই সরকারের কাছে কি আমরা শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার প্রত্যাশা করতে পারি?” ইউটিইউসি নেতা ‘ইস্ট পোস্ট’-কে বললেন।
চক্রবর্তী ইউরোপের ভেতরের নীতি আর বাইরের আচরণের মধ্যে পার্থক্যটা তুলে ধরলেন।
“বাণিজ্যিক শুল্কের মতো enforceable নয়। বরং তা পর্যবেক্ষণ ও dialogue র মাধ্যমে দেখা হয়। ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ, মেক্সিকোতে labour standards লঙ্ঘিত হলেও কোন বাণিজ্যিক শাস্তি হয়নি। মনে রাখা দরকার, ইইউ তাদের কর্পোরেট ও দেশগুলোর স্বার্থই দেখবে। ভারতের শ্রমিকদের স্বার্থ নয়। ইইউ যেগুলো গুরুত্ব দেয়, তা হল—শিশু শ্রম, forced labour, extreme inequality।”
একটু নেতা ‘ইস্ট পোস্ট’-কে আরও বলেন, “Piketty র আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্ট বলছে, দুনিয়ায় ভারতই most unequal nation। তাও এই চুক্তি হল। শোষণের সবচেয়ে কুৎসিত, কদর্যতম রূপটাই দেখে ইইউ। কোন প্রশ্নে কিছু compliance না হলে তারা ধরবে কর্পোরেট সংস্থাগুলোকে। ভারত সরকারকে নয়।”
চক্রবর্তী লেবার কোডের নতুন বাস্তবতার কথা বলতে গিয়ে চমকে দেওয়া তথ্য দিলেন: “যেহেতু লেবার কোড এই compliance কেই অনেক দুর্বল করে দিল, নিয়োগকর্তাই এরপর থেকে দেবে self certification (সমস্ত শ্রম বিষয়ক ক্ষেত্রে) আর তাতেই সরকার দেবে শিলমোহর, ফলে কোন সংস্থারই কোন অসুবিধে হবে না। লেবার কোড সবচেয়ে বড় আঘাত হেনেছে শিল্প সংস্থায় আচমকা পরিদর্শন করার আই এল ও র যে শর্ত রয়েছে, তার উপর। এটা ইইউ জানা সত্ত্বেও চুক্তি হল। দৈনিক কাজের সময় ১২ ঘন্টা আইএলও-র ঘোষিত labour standards এর বিরুদ্ধে যায়। শ্রম কোড decent work এর পরিপন্থী। কিন্তু যেহেতু এই compliance হচ্ছে কি হচ্ছে না তার শংসাপত্র দেবে সংস্থা নিজেই, ইউনিয়ন নয়, বা ইউনিয়নের কাছ থেকেও তা জেনে নেওয়ার কোন ব্যবস্থা নেই, তাই সরকার—নিয়োগকর্তার বক্তব্যই চূড়ান্ত গণ্য করা হবে।”
দত্ত পুরো বিষয়টাকে আরও বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে রাখলেন: “পুঁজিবাদের মূল সংকট, যার একটা অংশ হলো পুঁজির সঞ্চয়নের গতি বাড়ার সাথে সাথে সামগ্রিক লাভের দর কমে যাওয়া, সেই সংকট প্রথম বিশ্বকে ঘিরে ফেলেছে। বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকট হচ্ছে—আমেরিকা এতো দিনের বন্ধু ইউরোপকে সংকটে ঠেলে দিতে চাইছে, ইউরোপ যেকোনো প্রকারে সেখান থেকে বেরোতে গিয়ে বড় বাজার খুঁজছে—চীন তো নিজেই রপ্তানিকারক, তাই ভারতের বাজার চাই। ভারতের কাছে দেওয়ার মতো কি রয়েছে? সস্তার শ্রম, বিধিনিষেধহীন শ্রম শোষণের টোপ—দেশি বিদেশি পুঁজির কাছে। কাজেই এই সমস্ত এগ্রিমেন্টের কারণই হলো সংকটকে শ্রমজীবী মানুষের ওপর চালান করা, কোনো স্ট্যান্ডার্ড লাগু করা নয়।”
দত্ত ‘ইস্ট পোস্ট’-কে একটা কষ্টকর সত্য বলতে গিয়ে আর কোনো রাখঢাক করলেন না, “ভারত রাষ্ট্রের দেশের শ্রমিকদের ব্যাপারে কি মানসিকতা তা প্রতি বছর কারখানায় ম্যানেজমেন্টের দ্বারা ন্যূনতম শ্রম বিধি না মানার কারণে জীবন্ত পুড়ে যাওয়া শ্রমিকদের লাশ দেখলেই বোঝা যায়, কলকাতার সদ্য হয়ে যাওয়া হত্যাকাণ্ড দেখলেই বোঝা যায়।”
ভারতের ট্রেড ইউনিয়ন রাজনীতি ও মার্কিন বৈপরীত্য
ইইউ-ভারত চুক্তিতে শ্রম আইনের কথা আছে—মার্কিন-ভারত যৌথ বিবৃতিতে তার কোনো চিহ্নও নেই। অথচ একই ওয়াশিংটন বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথ বিবৃতিতে কম শুল্কের শর্ত হিসেবে শ্রম অধিকারের কথা জোরালোভাবে উল্লেখ করেছে। ভারতের ক্ষেত্রে সেটা উধাও।
শ্রমিক নেতারা এতে একটা গভীর বৈপরীত্য দেখছেন। তাঁদের আশঙ্কা: মার্চের মধ্যে চূড়ান্ত হতে পারে ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি, যেখানে কর্পোরেট খাতের জন্য নিয়ম আরও শিথিল করা হতে পারে। আর ভারতের অসহায় কৃষিকে প্রতিযোগিতায় ছাড়া হবে মার্কিন কৃষির সঙ্গে—যে খাতে মার্কিন সরকার বছরে ৪,২০০ কোটি ডলারের বেশি ভর্তুকি দেয়।
শ্রমিক আন্দোলনের নেতাদের কাছে ইইউর ধারাগুলো যেমন ফাঁকা বুলি, তেমনই মার্কিন বিবৃতিতে শ্রম অধিকারের নীরবতাও সমান বার্তা দেয়—দুটো পথেই শ্রমিকরা উন্মুক্ত ও অরক্ষিত থেকে যাচ্ছে।
ভারত যত দ্রুত বাণিজ্য চুক্তির দিকে ছুটছে, মোদী সরকার প্রবৃদ্ধি আর বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। আর ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা দিচ্ছেন প্রতিরোধের প্রতিশ্রুতি। কাগজে লেখা শ্রম আইন আর মাটির বাস্তবতায় শ্রমিকের জীবনের মধ্যে এই লড়াই এখন কারখানার গেট পেরিয়ে বাণিজ্য করিডোরেও পৌঁছে গেছে।


