Close

Millennium Park: পৌরসভা আর কেএমডিএ-র দোটানায় তিন বছর বেতন বন্ধ কর্মচারীদের

দুঃস্থ অবস্থায় রয়েছে কলকাতার মিলেনিয়াম পার্ক (Millennium Park)। লকডাউন থেকে মাত্র ১৭ দিন বাদে আর বেতন পাননি ৩৯ জন কর্মচারী। কেএমডিএ আর পৌরসভার মধ্যে মালিকানা বদলে অনিশ্চিত কর্মীদের ভবিষ্যৎ। বন্ধ সরকারের আয়ও।

Millennium Park

ছবি: সৌম্য মন্ডল

২৩শে ডিসেম্বর ২০২২ থেকে মিলেনিয়াম পার্কে (Millennium Park) প্রবেশ মূল্য লাগছে না। সময় সীমার মধ্যে প্রবেশ অবাধ করা হয়েছে। অন্যদিকে বন্ধ হয়ে আছে পার্কের ভেতরের দোকান, বন্ধ শিশুদের রাইড। বন্ধ কর্মচারীদের বেতনও। জীবিকা অনিশ্চিত হয়েছে শতাধিকের।

নতুন শতাব্দীকে উদযাপন করতে তৈরি হয়েছিলো হুগলী নদী এবং স্ট্র্যান্ড রোডের মাঝে মিলেনিয়াম পার্ক (Millennium Park)। শতাব্দীর প্রথম নববর্ষের পাঁচ দিন আগে, ১৯৯৯ সালের ২৬শে ডিসেম্বর পার্ক উদ্বোধন হয়। কলকাতা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (Kolkata Metropolitan Development Authority) বা কেএমডিএ (KMDA) তৈরি করে পার্কটি। গঙ্গাতীরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্যোগের প্রথম পর্বে মিলেনিয়াম পার্ক (Millennium Park) তৈরি হয়। এই পার্ক কলকাতা শহরের পরিচয়ের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছিল। অথচ ২০ বছর পার হতেই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বিনোদন পার্কটির ভবিষ্যৎ। 

২০২০ সালে লকডাউনে বন্ধ হয়ে যায় মিলেনিয়াম পার্ক (Millennium Park)। ফলত জীবিকা হারান পার্কে কর্মরত পাঁচ জন ইলেক্ট্রিশিয়ান, ৩৯ জন সিভিল অর্থাৎ সিকিউরিটি গার্ড, মালী এবং দোকান এবং রাইডের সাথে যুক্ত কর্মচারীরা। ২০২০ সালের মার্চ থেকে তাঁদের বেতন বন্ধ হয়ে যায়।

২০২১ সালে দুর্গাপূজোর পর তিন মাসের জন্য পার্ক খুলে আবার বন্ধ হয়ে যায়। এরপর, ২০২২ সালে ৬ই ডিসেম্বর পার্ক খুললেও ২৩শে ডিসেম্বর কেএমডিএ-র থেকে মিলেনিয়াম পার্কের (Millennium Park) দ্বায়িত্ব চলে যায় কলকাতা পৌরসভা (Kolkata Municipal Corporation) বা কেএমসির (KMC) হাতে। তার পর থেকে পার্কে প্রবেশ মূল্য যেমন নেই, তেমনি নেই দোকান, রাইড, কর্মচারীদের বেতন। কর্মচারীরা বলেছেন কেএমডিএ-র অধীনে ২০২১ সালের তিন মাস এবং ২০২২ সালের ১৭ দিনের কাজের টাকা পেলেও পৌরসভার অধিনে তিন মাস তাঁরা বেতন পাননি।

ঠিকাদারের অধীনে কাজ করেন মিলেনিয়াম পার্কের (Millennium Park) কর্মচারীরা। ঠিকাদার বদলে গেলেও কর্মচারীরা রয়ে যান। কিন্তু ২৩শে ডিসেম্বর থেকে কোনো ঠিকাদার মিলেনিয়াম পার্কের (Millennium Park) ঠিকাদারি পাননি, তবুও কর্মচারীরা কাজ করে চলেছেন। তবে কার অধীনে কাজ করছেন, কে মাইনে দেবে কিছুই জানেন না তাঁরা। তবুও তারা নিয়মিত পয়সা খরচ করে পার্কে আসছেন, রোজ কাজ করছেন, চাকরি টিকিয়ে রাখার আশায়।

বছর পঞ্চাশের আলিবর্দি (নাম পরিবর্তিত)  সিকিউরিটি গার্ডের কাজ করতে আসেন হুগলি জেলার একটি শহর থেকে। আলিবর্দি  বলেন, “আমাদের কেএমসির সাহেব এসেছিল, বলেছিল ২৩ তারিখ (ডিসেম্বর) থেকে তোমরা ডিউটি চালিয়ে যাও। বলেছিল কেএমডিএ টাকা না দিলে আমরা দেব। তিন মাস হয়ে গেল, কোনো খবর নেই। আমরা পারছিনা আর। এখন পার্কে আসার পাশাপাশি লঞ্চে মাল নিয়ে যাচ্ছি, স্টল লাগাচ্ছি, এই ভাবে চলছে।”

শেওড়াফুলির অভিজিৎ সাহা (৩৮) ২২ বছর পার্কে কাজ করছেন। তিনি মিলেনিয়াম পার্কের তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত ইউনিয়নের সম্পাদক। সাহা আমাদের বলেন, “আমরা কনফিউজ হয়ে গেছি। তিন বছর ধরে মাইনে পাইনি। ওনাদের জানিয়েছি, ওনারা বলেছেন হবে, তোমাদের নাম, চিঠি সব স্ট্যাম্প মেরে রেখে দেওয়া হয়েছে। তারপর বললেন যে এটা ফ্রি হবে নাকি টিকিট দিয়ে হবে ঠিক হয়নি। ফ্রি হলেও আপনারা থাকবেন, টিকিট দিয়ে হলেও আপনারা থাকবেন। কিন্তু কবে হবে সেই উত্তর আমরা পাচ্ছিনা এখন উদ্যান বিভাগের প্রধান দেবাশীষ কুমারের সাথে কথা বলেছিলাম আমরা। প্রথমে বলেছিল ১৫ দিন অপেক্ষা করো তোমাদের হয়ে যাবে, কিন্তু ১৫ দিনের জায়গায় আজ তিন মাস হয়ে গেল। এখন কোনো সময় রাজ মিস্ত্রির কাজ করছি, কোনো সময় ইলেক্ট্রিকের কাজ করছি। এইভাবে কোনো রকমে চলছে।”

বন্দর অঞ্চলল থেকে ২৩ বছর ধরে পার্কে সিকিউরিটির কাজ করতে আসেন বছর পঞ্চাশের রাজু দাস(নাম পরিবর্তিত)। তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মচারী ইউনিয়নের সদস্য হলেও ২০শে মার্চ CITU আয়োজিত পৌরসভার সামনে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন। দাস বলেন, “লকডাউনে আমরা কোনো মাইনে পাইনি, উপরন্তু আমরা এসে পার্ক দেখে গেছি। কোনো ইসআই-পিএফ নেই।” দাস পঙ্গু দিদির সাথে ভাড়া বাড়িতে থাকেন, তিনি বলেন, ধার করে, জমানো টাকা দিয়ে, এখানে ওখানে কাজ করে, কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছেন তিনি।

দাস আরো বলেন, “আগে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৮.৩০ পর্যন্ত পার্ক খোলা থাকতো। বাচ্চারা রাইডে চড়তো। এখন ৫.৩০ এর মধ্যে পার্ক বন্ধ করে দিতে হয়। এখন রাইড নেই, বাচ্চাদের বাবা-মা’রা এসে আমাদের কাছে রাগারাগি করে।”

বেহালার মনোজ গুপ্তার বয়স ৪৫। তিনি বাচ্চাদের রাইড গুলো চালাবার দায়িত্বে ছিলেন। এখন গুপ্তা বেকার, তার কর্মচারীরাও বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে গেছে। গুপ্তা বলেন, “কেএমসি বলেছে এখন বন্ধ রাখো। কিন্তু কবে চালু করবে কোনো কথা হয়নি। তিরিশ জনের মতন রাইডে কাজ করতো। কোনো মাসে ৩০/৪০ হাজার টাকা মত আয় হত।” 

পার্কের ভিতর সমস্ত খাবারের দোকান এখন বন্ধ, স্বাভাবিক ভাবেই রাইডের মতই গাছের শুকনো পাতা, ধুলো জমেছে দোকানে। খাবারের দোকানের মালিক সঞ্জয় দাস জানালেন যে কতৃপক্ষ এখন তাঁদের কিছুই জানাচ্ছে না।

Millennium Park:
Millennium Park: রাইড বন্ধ থাকায় আয় নেই সরকারের

বিরাশি বছরের বৃদ্ধ ভাগ্যধর পাত্র দামোদর ফেব্রিকেটরস-এর কর্ণধার। পাত্র কেএমডিএ-র কাছে পার্ক চালানোর জন্য তিন বছরের ঠিকা পেয়েছিলেন; তবে পার্ক চালিয়েছেন মাত্র ১৭ দিন। এই ১৭ দিনের বেতন তিনি কর্মচারীদের মিটিয়ে দিলেও নিজে এখনও কেএমডিএ থেকে টাকা পাননি। পাত্র বলেন, “কেএমডিএ বলছে কর্পোরেশন পার্ক নিয়ে নিয়েছে, আমাদের হাতে নেই, এই বলে অর্ডার ক্যানসেল করে দিয়েছে।”

কেএমডিএ-র কাছে টাকা পেয়েছেন কিনা জিজ্ঞাসা করা হলে পাত্র বলেন, “কেএমডিএ এটা দাও, সেটা দাও বলে ঘোরাচ্ছে, এখন ১৭ দিনের টাকা দেয়নি। আমরা ববি হাকিমের সাথে দেখা করার চেষ্টা করেছি, দু দিন সময়ও দিয়েছিলেন, কিন্তু আজ আর কথা হবে না বলে চলে গেলেন।”

কলকাতা কন্ট্রাক্টরস ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক খোকন মজুমদার বলেন, “মিলেনিয়াম পার্ক (Millennium Park) আগে ছিলো কেএমডিএ-র হাতে, হঠাৎ চলে গেল কেএমসির আন্ডারে, কেন হল জানিনা। আমরা বললাম তোমরা যে ছেড়ে দিলে, এবার কর্মচারীদের কী হবে? কেএমডিএ বলেছিল কেএমসি দায়িত্ব নেবে। কেএমডিএ-তে এরা (কর্মচারীরা) লকডাউনে বেতন পায়নি। আন্দোলন করার পর নতুন কন্ট্রাক্টর আসলো, তাকে সরিয়ে কেএমসি নিল, এখন তিন মাস এরা কোনো বেতন পাচ্ছে না। কিন্তু এরা এখনো কাজ করে যাচ্ছে।”

CITU এর জেলা সেক্রেটারিয়েট সদস্য সৌম্যদীপ রজক বলেন, “২০২১ সালে দুর্গাপূজোর সময় পার্ক খোলে। তিন মাস মত পার্ক চলার পর,ঠিকাদার টাকা মেরে দিয়ে পালায়। কেএমডিয়ে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে রহস্যজনক ভাবে কোনো ব্যাবস্থা নেয়নি। পার্ক আবার বন্ধ হয়ে যায়। তারপর খোলে আবার ২০০২ সালে ডিসেম্বরে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে মমতা ব্যানার্জির মর্নিং ওয়াকে গিয়ে কী দেখে ওনার মনে হয় কেএমডিএ (মিলেনিয়াম পার্ক) চালাতে পারছে না! উনি বলেন, ববি এটা কর্পোরেশনে নিয়ে নাও।এক রাতের মধ্যে কেএমডিএ এটা হ্যান্ডওভার করে দেয়।” 

রজক আরো বলেন, “কেএমসির সাথে আমরা যখন কথা বলি, তখন ওরা অদ্ভুত যুক্তি দিয়েছে। ওনারা বলছেন আমরাতো পার্কের দায়িত্ব নিয়েছি, পার্ক আমাদের কেএমডিএ হ্যান্ডওভার করেছে কিন্তু ম্যানপাওয়ার আমাদের হ্যান্ডওভার করেননি। এই ৪৪ জন কার্যত মরতে বসেছে।” 

Millennium Park: টিকিট বিক্রি বন্ধ থাকায় প্রবেশ অবাধ হয়েছে
Millennium Park: টিকিট বিক্রি বন্ধ থাকায় প্রবেশ অবাধ কিন্তু এর ফলে আয় বন্ধ পার্কের

যদিও জানা গেছে ৪৪ জন কর্মচারীর মধ্যে মাত্র পাঁচজন ইলেকট্রিক্যাল কর্মচারী গত তিন মাস বেতন পেয়েছেন। কিন্তু ৩৯ জন এখনো মাইনে পাননি। CITU মিলেনিয়াম পার্ক ইউনিয়নের কর্মী বিদ্যুৎ দাস(নাম পরিবর্তিত) নিজে একজন ইলেক্ট্রিক্যাল কর্মচারী। দাস জানান, “পার্ক পরিচালনার জন্য কোনো কন্ট্রাক্টর এখনো লিপিবদ্ধ হয়নি। ফলে কর্মচারীরা কোন অবস্থায় কাজ করছে, কার মাধ্যমে কাজ করছে কিছুই বুঝতে পারছিনা। যদিও তিনি জানালেন ইলেক্ট্রিকাল এর পাঁচ জন মাইনে পেয়েছেন। কেএমডিএ-ই মাইনে দিয়েছে।” 

প্রসঙ্গত কেএমডিএ-র দায়িত্ব প্রাপ্ত মন্ত্রী এবং কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র উভয় পদেই বসে আছেন ফিরহাদ হাকিম।সুতরাং প্রশ্ন জাগে কেন হাকিম পরিচালিত কেএমডিএ মিলেনিয়াম পার্কের (Millennium Park) রক্ষণাবেক্ষণে ব্যর্থ হওয়ার পর আবার হাকিম দ্বারাই পরিচালিত কেএমসির হাতে সেই দায়িত্ব দেওয়া হল? কেন প্রবেশ মূল্য ও রাইড থেকে সরকারের যে আয় হত তা বন্ধ করা হল? কেন কেএমডিএ থেকে কেএমসি পার্ক হাতে নেওয়ার পরেও কর্মচারীদের দায়িত্ব নেওয়া হল না? ফিরহাদ হাকিমকে এই বিষয়ে ফোন করা হলে তিনি কোনো উত্তর দেননি।

মিলেনিয়াম পার্কের (Millennium Park) কর্মচারীদের বকেয়া বেতন ও চাকরি সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষ ইস্ট পোস্ট বাংলাকে বলেন, “আমার সাথে কথা বলবেন না, আমার পিএ এর নাম্বার দিয়ে দিচ্ছি। পিএর সাথে যোগাযোগ করে কথা বলুন।” যদিও পিএ এর নাম্বার তিনি পাঠাননি।

লেখক

  • সৌম্য মন্ডল

    সৌম্য মন্ডল একজন আর্থ-সামাজিক এবং ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তিনি ইস্ট পোস্ট বাংলায় মুখ্য সম্পাদক হিসাবে কর্মরত। মূলত উদীয়মান বহু-মেরুর বিশ্বের নানা ঘটনাবলীর তিনি বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করেন।

সৌম্য মন্ডল একজন আর্থ-সামাজিক এবং ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তিনি ইস্ট পোস্ট বাংলায় মুখ্য সম্পাদক হিসাবে কর্মরত। মূলত উদীয়মান বহু-মেরুর বিশ্বের নানা ঘটনাবলীর তিনি বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করেন।

Leave a comment
scroll to top