ফেব্রুয়ারি মাসের মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ার দুটি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করে ফেলেছে। ৬ ফেব্রুয়ারি ভারতের সঙ্গে অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তির যৌথ বিবৃতি প্রকাশের মাত্র তিন দিনের মাথায়—৯ ফেব্রুয়ারি—হোয়াইট হাউস বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির আরেকটি যৌথ বিবৃতি জারি করেছে।
ভারতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই বাণিজ্য চুক্তি তীব্র রাজনৈতিক ঝড় তুলেছে। বাম থেকে মধ্য-বাম—সবাই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও তাঁর কট্টর ডানপন্থী দল ভারতীয় জনতা পার্টিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। অভিযোগ একটাই—আমেরিকার কাছে সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এই চুক্তি নিয়ে কোনো প্রতিবাদের আওয়াজ নেই বললেই চলে। কারণটা সহজ—দেশের রাজনৈতিক মঞ্চ তখন আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের প্রচারণায় তোলপাড়।
দক্ষিণ এশিয়ার জন্য মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি: লাভ কার?
দুই দেশের কর্তৃপক্ষই এই চুক্তিকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে উদযাপন করছে। কিন্তু চুক্তির সূক্ষ্ম ভাষাটা পড়লে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র ভেসে ওঠে। ট্রাম্পের আগের শুল্ক কমিয়ে একটা চুক্তিতে রাজি করানো নিঃসন্দেহে একটা কৃতিত্ব, কিন্তু সামগ্রিক মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে—দুই ক্ষেত্রেই ওয়াশিংটন এই দেশগুলোকে বুলডোজার দিয়ে মাড়িয়ে যাচ্ছে।
ভারতে বিরোধী দলগুলো অন্তর্বর্তী চুক্তির অস্বচ্ছতা ও মোদীর নতিস্বীকারের তীব্র সমালোচনা করার পর ওয়াশিংটন চুক্তির ভাষায় কিছু সংশোধন এনেছে—ডাল-শুঁটি জাতীয় কৃষিপণ্য ভারতীয় বাজারে ঢালার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এমনকি পাঁচ বছরে ৫০,০০০ ডলারের মার্কিন পণ্য কেনার বাধ্যবাধকতার জায়গায় লেখা হয়েছে, নয়া দিল্লি কেনার ‘ইচ্ছা পোষণ করছে’। বাংলাদেশ কিন্তু এই সুবিধাটুকুও পায়নি।
মার্কিন এই বাণিজ্য চুক্তিগুলো স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে ট্রাম্প দুর্বল দেশগুলোকে অনুগত রাখতে, সম্মতির পুরস্কার দিতে এবং মার্কিন কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখতে এই চুক্তিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। ওয়াশিংটন অংশীদারিত্বের কথা বলছে, কিন্তু চুক্তির কাঠামো বলছে সম্পূর্ণ উলটো গল্প।
অসমতার আয়না: ভারত বনাম বাংলাদেশ
ভারত উপমহাদেশের বড় সামরিক শক্তি। তথাকথিত ‘ইন্দো-প্যাসিফিক যুদ্ধাঞ্চলে’ চীনকে ঠেকাতে পেন্টাগনের অংশীদার। তবুও ট্রাম্প ভারতের সঙ্গে যথেষ্ট কঠোর আচরণই করেছেন। আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তো আরও নির্মম—যদিও ঢাকার নেতৃত্ব অত্যধিক নমনীয়তা দেখিয়েছে, সমালোচকরা যাকে রীতিমতো দাসত্বের সঙ্গে তুলনা করছেন।
চুক্তির সূক্ষ্ম ভাষাটা একটু পড়া যাক। মার্কিন-বাংলাদেশ যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মার্কিন শিল্পপণ্য ও কৃষিপণ্যের জন্য উল্লেখযোগ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা দিতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে রাসায়নিক পণ্য, চিকিৎসা সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি, মোটরগাড়ি ও যন্ত্রাংশ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সরঞ্জাম, জ্বালানি পণ্য, সয়া পণ্য, দুগ্ধজাত পণ্য, গরুর মাংস, মুরগির মাংস এবং বাদাম ও ফলমূল।
এখন বাংলাদেশের কৃষি খাতের বাস্তব চিত্রটা দেখুন। দেশের মোট কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর ৩৮ থেকে ৪০% কৃষিতে জড়িত, অথচ এই খাত জিডিপিতে অবদান রাখে মাত্র ১১.১১%। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই খাতের মোট অবদান ছিল প্রায় ৫,০২৫ কোটি ডলার। সার ও সেচে ভর্তুকি বাবদ সরকার সেই বছর খরচ করেছে মাত্র ১৫০ কোটি ডলার। এবার এই সংখ্যার সঙ্গে তুলনা করুন মার্কিন সরকারের সেই বিশাল ৪,২৪০ কোটি ডলারের নগদ ভর্তুকি, যা সেদেশের কৃষকরা পায়। এই গভীর ব্যবধান শুধু সংখ্যায় নয়, চুক্তির প্রতিটি ছত্রেও প্রতিফলিত।
মার্কিন দুগ্ধপণ্য, মুরগির মাংস আর গরুর মাংস বাংলাদেশের বাজারে ঢুকলে কী হতে পারে? পোল্ট্রি শিল্পে বাংলাদেশের ৭০ হাজারেরও বেশি খামারে কাজ করেন প্রায় ৮০ লাখ মানুষ। গরু পালন ও মাংস উৎপাদনে জড়িত আরও পাঁচ লাখের বেশি মানুষ—এই খাত আগে থেকেই টালমাটাল। আর দুগ্ধ উৎপাদনে বাংলাদেশ ৯১ থেকে ৯৫% স্বয়ংসম্পূর্ণ, এখানে কাজ করেন ১৪ থেকে ১৫ লাখ মানুষ।
ভারী ভর্তুকিপুষ্ট ও যন্ত্রনির্ভর মার্কিন কর্পোরেশনের পণ্যের সামনে এই খাতগুলো খুলে দিলে সংকট আরও গভীর হবে এবং বাংলাদেশের কৃষি সার্বভৌমত্বে মারাত্মক আঘাত আসবে।
বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র কী দিচ্ছে? পারস্পরিক শুল্ক হার ১৯% নামিয়ে আনার আশ্বাস এবং ‘কিছু’ পণ্যে শূন্য শুল্কের কথা বিবেচনা করার প্রতিশ্রুতি। কিন্তু বাংলাদেশ বছরের পর বছর ধরে ৫,৭০০-এরও বেশি পণ্য মার্কিন বাজারে রপ্তানি করে আসছে—সেগুলোর মধ্যে ঠিক কতটিতে এই সুবিধা পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি নেই।
পোশাক শিল্পের শূন্য শুল্ক: স্বপ্ন, নাকি ফাঁদ?
বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ সবচেয়ে বেশি উৎফুল্ল হয়েছে তৈরি পোশাক খাতে শূন্য শুল্কের প্রতিশ্রুতি পেয়ে। কিন্তু যা লুকিয়ে যাচ্ছেন তা হলো, মার্কিন পক্ষ স্পষ্ট বলেছে—এই সুবিধা নির্ভর করবে একটি বিশেষ ব্যবস্থা চালু হওয়ার ওপর।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে একটি ‘নির্দিষ্ট পরিমাণ’ পোশাক ও বস্ত্র এই কমানো শুল্কে মার্কিন বাজারে ঢুকতে পারবে—তবে সেই পরিমাণ নির্ধারিত হবে বাংলাদেশ কতটা মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করছে, তার ওপর ভিত্তি করে।
সহজ ভাষায় বলতে গেলে: তুমি যদি আমার কাঁচামাল কিনো, তবেই তোমার পোশাক সস্তায় বিক্রি করতে দেব। মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তুর দাম তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়বে, এবং শূন্য শুল্কের সুবিধা থাকলেও বাংলাদেশের পোশাক শিল্প চীন ও ভিয়েতনামের কাছে মার্কিন বাজারে টিকতে পারবে না।
সার্বভৌমত্বের ক্ষয়
এই চুক্তির আরও একটি গভীর দিক রয়েছে—চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে সংকুচিত করে দেওয়া। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে বেইজিং বাংলাদেশে যে বিনিয়োগ করছে, তা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র এমন কিছু ধারা ঢুকিয়ে দিয়েছে, যা ঢাকাকে বাধ্য করবে সব বিদেশি বিনিয়োগের বিস্তারিত তথ্য ওয়াশিংটনকে জানাতে।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুই দেশ অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা সমন্বয়কে শক্তিশালী করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ—এর মধ্যে রয়েছে অসৎ বাণিজ্য প্রথার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ, শুল্ক ফাঁকি রোধ, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা এবং বিনিয়োগ তথ্য ভাগ করে নেওয়া।
এর অর্থ দাঁড়ায়: ভবিষ্যতের বাংলাদেশ সরকারগুলোকে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক যুদ্ধাঞ্চলে’ চীনের প্রভাব মোকাবেলায় মার্কিন কৌশলে সামিল হতে চাপ দেওয়া হবে এবং তৃতীয় পক্ষের কাছে বিদেশি বিনিয়োগের তথ্য না জানানোর সার্বভৌম অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে। এটা কেবল অর্থনৈতিক চুক্তি নয়—এটি বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতার ওপর নব্য-ঔপনিবেশিক কব্জা।
তেতো বড়ি গিলছে বাংলাদেশ
চুক্তির শর্তগুলো আরও পড়লে স্পষ্ট হয়, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর একের পর এক কঠোর বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দিয়েছে। আমেরিকান যানবাহনের মান মানতে হবে, মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের অনুমোদনকে স্বীকৃতি দিতে হবে, সীমানা পেরিয়ে অবাধ ডেটা প্রবাহের অনুমতি দিতে হবে, মেধাস্বত্ব বলবৎকরণ জোরদার করতে হবে এবং ওয়াশিংটনের পছন্দমতো শ্রম আইন সংশোধন করতে হবে। এগুলো ছোটখাটো সমন্বয় নয়—এগুলো হলো একটি দেশের অভ্যন্তরীণ নীতির ওপর বাইরের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।
এখানেই শেষ নয়। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে বাংলাদেশ তাদের কাছ থেকে বিমান কিনুক। গম, সয়া, তুলা ও ভুট্টাসহ ৩৫০ কোটি ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য কিনতে হবে—যা ২০২৪-২৫ সালের বাংলাদেশের মোট কৃষি উৎপাদনের প্রায় ৬.৯%। পনেরো বছরে ১,৫০০ কোটি ডলারের মার্কিন জ্বালানি পণ্যও কিনতে হবে।
আর বিনিময়ে বাংলাদেশের জন্য? কোনো কংক্রিট গ্যারান্টি নেই। শুধুই প্রতিশ্রুতির কুয়াশা।
সমস্যার নাম: অনির্বাচিত সরকারের চুক্তি
১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠন হবে। কিন্তু জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সরকার ক্ষমতায় আসার আগেই অন্তর্বর্তী সরকার অস্বচ্ছ আলোচনার মধ্য দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে এই যৌথ বিবৃতিতে সম্মতি দিয়ে বসেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস এই আলোচনার সমাপ্তিকে সাফল্য বলে উদযাপন করছেন। কিন্তু চুক্তিতে স্বাক্ষরের দায়ভার পড়বে নির্বাচিত সরকারের ঘাড়ে। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক শক্তিকে—এমনকি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকেও—নিজের ছত্রছায়ায় আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন বামজোট ছাড়া কোনো দলই ওয়াশিংটনের নির্দেশিত শর্তের বিরোধিতায় সরব হয়নি।
এই জটিল ও সংকটময় পরিস্থিতি থেকে নির্বাচিত সরকার কীভাবে বেরিয়ে আসবে—সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।


