Close

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন ট্রাম্প

ক্রমবর্ধমান ক্ষয়ক্ষতি, লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি এবং একটি হত্যাকাণ্ড — যা তেহরানকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে — ওয়াশিংটনকে যুদ্ধবিরতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ থেকে নিস্তার পেতে চাইছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। খুঁজছেন ইরানের সাথে অস্ত্র বিরতির সুযোগ। কিন্তু এই ডিগবাজির কারণ কী?

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ থেকে চুপিসারে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর প্রশাসন মার্চের মাঝামাঝি নাগাদ যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে যুদ্ধ থেকে সরে পড়ার পরিকল্পনা করছে বলে ইস্ট পোস্টকে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

মার্কিন সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থার উচ্চপদস্থ সূত্র জানাচ্ছে, ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. মাসউদ পেজেশকিয়ান ওয়াশিংটনের সামনে তিনটি শর্ত উপস্থাপনের বেশ কয়েক দিন আগে থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির বিকল্প খোঁজা শুরু করেছিলেন। এই শর্তগুলো পূরণ হলে যুক্তরাষ্ট্র আরও বৃহত্তর সংঘাতে না জড়িয়েই এই যুদ্ধ থেকে পিছু হটতে পারবে।

মার্কিন সরকারের সূত্র জানায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ড. পেজেশকিয়ান ও ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে রাজি হয়েছেন — তবে এটি তাঁর জন্য আরও জটিলতা তৈরি করবে। প্রথমত, এতে একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ইরানের কাছে নতি স্বীকার করতে দেখা যাবে। দ্বিতীয়ত, এটি ইসরায়েলকে একাকী ফেলে দেবে, যে দেশটি নিজের লবিস্টদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে টেনে এনেছিল।

হোয়াইট হাউসের ভেতরে কর্মকর্তারা ক্রমশ স্বীকার করছেন যে এই সংঘাত কৌশলগত ও রাজনৈতিকভাবে ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। পশ্চিম এশিয়াজুড়ে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ইরানি হামলা ক্ষতি করেছে, তেলের দাম হু হু করে বেড়েছে এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দেশের ভেতরে চাপ তীব্র হচ্ছে।

ইরানের নেতৃত্বকে দুর্বল করতে যে অভিযান শুরু হয়েছিল, তা এখন ওয়াশিংটনের জন্য একটি কৌশলগত দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। আমেরিকার শক্তি প্রদর্শনের জন্য শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এখন এক দীর্ঘায়িত সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে — যা থেকে যুক্তরাষ্ট্র মরিয়া হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে।

ইরান যুদ্ধে মার্কিন ক্ষয়ক্ষতির ভার

ইরানের কৌশল ছিল মার্কিন বাহিনীর ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যয়ের ভার চাপানো।

এ ক্ষেত্রে সর্বাধিক আলোচিত হচ্ছে শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার। প্রতিটি ড্রোনের খরচ মাত্র ২০,০০০ থেকে ৫০,০০০ ডলার। অথচ এগুলো রোধ করতে প্রায়ই প্যাট্রিয়ট বা থাড ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হচ্ছে, যার দাম কয়েক মিলিয়ন ডলার। একটি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের দাম প্রায় ৪০ লাখ ডলার, আর একটি থাড ক্ষেপণাস্ত্রের দাম ১২ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। এই বিপুল ব্যবধান যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু ঘাঁটি রক্ষা করতেই বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয়ে বাধ্য করছে।

পেন্টাগনের কর্মকর্তারা কংগ্রেসকে জানিয়েছেন বলে খবর রয়েছে যে যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৬০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। আগের হিসাবে বলা হয়েছিল, এই সংঘাতে প্রতিদিন ১০০ কোটি ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে।

অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী, ইরানি হামলায় পশ্চিম এশিয়াজুড়ে মার্কিন সামরিক অবকাঠামোর ২০০ কোটি ডলারেরও বেশি ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করতে সময় লাগবে। রাডার নেটওয়ার্ক পুনর্গঠন করতে হবে, ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত আবার গড়তে হবে — এটি মাসের পর মাস, এমনকি বছরখানেক সময় নিতে পারে।

একই সময়ে, পেন্টাগনকে অন্যত্র, বিশেষত ইন্দো-প্যাসিফিকে সামরিক প্রস্তুতি বজায় রাখতে হচ্ছে, যেখানে চীনের সঙ্গে উত্তেজনা এখনও তীব্র।

ক্ষয়ক্ষতি বাড়তে থাকায় এবং ইরানের হামলা অব্যাহত থাকায়, কর্মকর্তারা বলছেন ট্রাম্প প্রশাসন এখনও এই যুদ্ধের কোনো সুস্পষ্ট কৌশলগত লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারেনি। গোপনে, একাধিক উপদেষ্টা প্রেসিডেন্টকে এমন একটি যুদ্ধবিরতির পথে হাঁটতে বলতে শুরু করেছেন, যা পরাজয় স্বীকার না করেও সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ দেবে।

২০২৮ সালের নির্বাচনে একসঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাওয়া ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন।

যে হত্যাকাণ্ড ইরানকে শক্তিশালী করেছে

ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা সাইয়েদ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ড এই যুদ্ধের সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী মোড়গুলির একটি।

ওয়াশিংটন ও তেল আবিব প্রথমে এই হত্যাকাণ্ডকে বড় কৌশলগত বিজয় হিসেবে উদযাপন করেছিল। কিন্তু পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ দেখাচ্ছে, এই হত্যাকাণ্ডের ফলাফল একেবারে উল্টো হয়েছে।

ইরানি কর্মকর্তারা দ্রুত খামেনির মৃত্যুকে শাহাদতের মর্যাদায় উপস্থাপন করেন। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতীকী তাৎপর্য সমগ্র মুসলিম বিশ্বে গভীর প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। ইসলামের পবিত্রতম মাস রমজানে, যখন দেশ বিদেশি হামলার মুখে, তখন সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করা হয়। ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জোর দিয়ে প্রচার করে যে আসন্ন হামলার সতর্কতা সত্ত্বেও তিনি তেহরান ছেড়ে যেতে অস্বীকার করেছিলেন। পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের নিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি তেহরানেই ছিলেন।

ইরানের বয়ানে এটি তাঁকে এমন একজন শহিদে পরিণত করে, যিনি যুদ্ধের সময় নিজের জনগণকে ছেড়ে না গিয়ে মৃত্যুকে বেছে নিয়েছেন।

এই প্রতীকটি আধুনিক ইতিহাসের আরেকটি মুহূর্তের কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৯৬৭ সালে বলিভিয়ায় চে গুয়েভারার মৃত্যু তাঁকে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধের বৈশ্বিক প্রতীকে পরিণত করেছিল। ইরানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খামেনির হত্যাকাণ্ড এই যুদ্ধে একই রকম গতিশীলতা তৈরি করেছে।

ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে দুর্বল করার বদলে এই হত্যাকাণ্ড ইরানের সংকল্পকে আরও দৃঢ় করেছে এবং বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের একটি উল্লেখযোগ্য অংশে সমর্থন জুটিয়েছে। তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে সাইয়েদ মুজতাবা খামেনির দ্রুত নিয়োগ ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার দৃঢ়তাকে আরও প্রমাণ করেছে।

ট্রাম্পের সমালোচকরা এই ঘটনাপ্রবাহকে তাঁর দুঃসাহসিকতার বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি একজন বৃদ্ধ ও অসুস্থ খামেনিকে সরিয়ে কার্যত তাঁরই তরুণ সংস্করণকে ক্ষমতায় বসিয়েছেন। শাসন পতনের বদলে এই হত্যাকাণ্ড ইরানের প্রতিরোধকে আরও মজবুত করে দিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

লক্ষ্যহীন যুদ্ধ

যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি, কারণ এর জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন দরকার হতো। পরিবর্তে ওয়াশিংটন তার অভিযানকে ‘প্রি-এম্পটিভ স্ট্রাইক’ বা আগাম প্রতিরোধমূলক হামলা বলে বর্ণনা করেছে।

তবে সমালোচকরা লক্ষ্য করছেন, এই অভিযান শুরুর ঠিক আগে ইরান মার্কিন ভূখণ্ডে কোনো আক্রমণ করেনি। তারপর থেকে এই যুদ্ধ পশ্চিম এশিয়ার একাধিক দেশে ছড়িয়ে পড়েছে, অথচ প্রশাসনের কৌশলগত লক্ষ্য এখনও অস্পষ্ট।

বিভিন্ন সময়ে ট্রাম্প ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা তেহরানে শাসন পরিবর্তনের আহ্বানের প্রতিধ্বনি করেছেন। কিন্তু সপ্তাহের পর সপ্তাহ লড়াইয়ের পরও সেই লক্ষ্য অর্জনের কোনো লক্ষণ নেই। ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা নেতৃত্বের ক্ষতি সামলে নিয়ে দ্রুত কমান্ডার প্রতিস্থাপনের সক্ষমতা দেখিয়েছে। সুস্পষ্ট কোনো লক্ষ্য না থাকায় ওয়াশিংটনের পক্ষে এই যুদ্ধ পরিচালনা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

মূল্যস্ফীতি, কফিন এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের রাজনীতি

ইরান যুদ্ধ মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেও ঢেলে সাজাচ্ছে।

ফেব্রুয়ারিতে ভোক্তা পণ্যের দাম আবার বেড়েছে — বাড়িভাড়া ওপরমুখী, জ্বালানি ও মুদিপণ্যে সংসারের খরচ বাড়ছে। মোটরিস্ট অ্যাডভোকেসি গ্রুপ এএএ-র তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘাত শুরুর পর থেকে গ্যাসোলিনের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে প্রতি গ্যালন প্রায় ৩.৫৮ ডলারে পৌঁছেছে। ইরান যুদ্ধে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় তেলের বাজারেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে এবং মূল্যস্ফীতি আরও ত্বরান্বিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এই মুহূর্তে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রাক্কালে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি একটি স্পর্শকাতর রাজনৈতিক ইস্যু।

একই সঙ্গে সংঘাতের মানবিক মূল্যও দৃশ্যমান হচ্ছে। মার্কিন হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে এবং জাতীয় পতাকায় মোড়া কফিন মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ফিরতে শুরু করেছে। ইরান যুদ্ধ থেকে আসা বডি ব্যাগের ছবি টেলিভিশন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে।

মূল্যস্ফীতি ও মৃতদেহ প্রত্যাবর্তনের এই যুগলবন্দি মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্ককে তীক্ষ্ণ করে তুলেছে। ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (মাগা) আন্দোলনের ভেতরে এই যুদ্ধ একটি ক্রমবর্ধমান বিভাজন তৈরি করেছে। একটি অংশ ইসরায়েলের প্রবল সমর্থক এবং ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার পক্ষে। অন্য অংশ যুক্তি দিচ্ছে যে এই যুদ্ধ ট্রাম্পের আগের সেই প্রতিশ্রুতির বিরোধী, যেখানে তিনি ব্যয়বহুল বিদেশি যুদ্ধ এড়ানোর কথা বলেছিলেন।

মার্কিন রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের মতে, মাগা আন্দোলনের ভেতরে ইসরায়েলপন্থী এবং ইসরায়েলবিরোধী গোষ্ঠীর মধ্যে ফাটল আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি স্পষ্ট। সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম যখন দাবি করেন যে নেতানিয়াহুর অনুরোধে তিনি প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধে ঠেলে দিয়েছেন, তখন ইসরায়েলবিরোধী মাগা সমর্থকদের হাতে আরও অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, এই যুদ্ধ ইসরায়েলপন্থী ডেমোক্র্যাটদেরও কোণঠাসা করে ফেলেছে। বিপুলসংখ্যক তরুণ উদারপন্থী নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানির মতো ইসরায়েলবিরোধী নেতাদের পেছনে সমাবেশিত হচ্ছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, মূলধারার মার্কিন গণমাধ্যমের সঙ্গে ট্রাম্পের দ্বন্দ্বের কারণে এবার সংবাদপত্রগুলো অতীতের মতো যুদ্ধপ্রচেষ্টায় সমর্থন জোগাচ্ছে না। বরং দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস অভিযানের শুরুতে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় ১৬৫ জন মেয়েশিশুর মৃত্যুর মর্মান্তিক দৃশ্য প্রকাশ করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রতিবেদন জনমানসে মেরুকরণকে আরও গভীর করেছে।

ভূরাজনৈতিক পরিণতি

ইরান যুদ্ধ পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনীতিকেও নতুন রূপ দিচ্ছে।

উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি হামলার নিন্দা করলেও সংঘাতে সরাসরি যোগ দেয়নি। এখন পর্যন্ত তারা ইরানে কোনো হামলা চালায়নি। কূটনীতিকরা বলছেন, এই সংযমের পেছনে রয়েছে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এবং চীনরাশিয়ার নীরব মধ্যস্থতা।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ব্যক্তিগতভাবে একাধিক উপসাগরীয় নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিস্থিতির আরও অবনতি এড়াতে অনুরোধ করেছেন। এই অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারক চীনও জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতার পক্ষে চাপ দিচ্ছে। চীন তার জ্বালানি সরবরাহ সুনিশ্চিত করায় উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর কেউই বেইজিংকে বিরক্ত করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এটি ইরানকে আরও নিরাপদ করেছে — কারণ ইরান চীনের কৌশলগত অংশীদার এবং ব্রিকসের সদস্য।

এই সংঘাত পশ্চিম এশিয়াজুড়ে মোতায়েন মার্কিন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাও উন্মোচন করেছে। ইরানি হামলায় একাধিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্যাট্রিয়ট, থাড ও ইসরায়েলের আয়রন ডোমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন ও রাশিয়া এই যুদ্ধ থেকে মার্কিন প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করার জন্য মনোযোগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। চীন ও রাশিয়ার স্যাটেলাইট চিত্র, অবিরাম ইউয়ান সরবরাহ এবং সামরিক গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগির ফলে এই অসম লড়াইয়ে ইরান আগের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে উঠে এসেছে। এই বাস্তবতা ট্রাম্পের সামনে সব পথ বন্ধ করে দিচ্ছে এবং তাঁর উপদেষ্টারা ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বাধ্য হচ্ছেন।

ইন্দো-প্যাসিফিকে চীনের সঙ্গে উত্তেজনা যখন ক্রমশ বাড়ছে, তখন এই যুদ্ধের শিক্ষা ভবিষ্যতের সংঘাতকে গুরুত্বপূর্ণভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

প্রস্থানের পথে ওয়াশিংটন

তেহরানের কাছে এই সংঘাত ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে চলে আসা দশকব্যাপী বৈরিতার চূড়ান্ত পরিণতি। ট্রাম্পের কাছে এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা: এমন একটি সংঘাত যার রাজনৈতিক যৌক্তিকতা দেশের ভেতরে দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে, আর বাইরে কৌশলগত ফল ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।

সামরিক ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে। তেলের দাম বৃদ্ধিজনিত মূল্যস্ফীতি মার্কিন সংসারে টান ধরাচ্ছে। আর ইরান যুদ্ধ থেকে পতাকায় মোড়া কফিনের ছবি আমেরিকার গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।

এই চাপগুলো মিলে প্রশাসনের বিকল্পের জায়গা সংকুচিত করছে। অভ্যন্তরীণ আলোচনার সঙ্গে পরিচিত কর্মকর্তাদের মতে, হোয়াইট হাউসের শীর্ষ মহল এখন সংঘাতের তীব্রতা কমিয়ে যুদ্ধবিরতির দিকে এগোনোর পথ খুঁজছে — আর প্রকাশ্যে ঘোষণা দেওয়া হবে যে মার্কিন লক্ষ্য ইতিমধ্যেই অর্জিত হয়েছে।

কোনো সময়সীমা নির্দিষ্ট না থাকলেও হোয়াইট হাউসের একজন জুনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ইসরায়েলি স্বার্থ বিবেচনায় রেখে প্রেসিডেন্ট ১৫ মার্চের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে ট্রাম্প কখন তা ঘোষণা করবেন, তা অনিশ্চিত। ইসরায়েলের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া এবং মার্কিন ইহুদিপন্থী মহলের ভূমিকা নিয়েও হোয়াইট হাউস উদ্বিগ্ন।

ট্রাম্পের উপদেষ্টারা বিশ্বাস করেন, এই প্রস্থান কৌশল ওয়াশিংটনকে সাফল্যের দাবি করার সুযোগ দেবে এবং একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে চুপচাপ সরে আসা যাবে।

তেহরান এই ফলাফল মেনে নেবে কিনা, তা এখনও অনিশ্চিত। ড. পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করে বলেছেন, সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটের পক্ষ থেকে আর কোনো হামলা না হওয়ার আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা — এই তিনটি শর্ত ইরানের জন্য অপরিহার্য।

ট্রাম্প যখন মার্কিন আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, ততক্ষণে এই যুদ্ধের কৌশলগত ভারসাম্য এমনভাবে বদলে গেছে যা ওয়াশিংটনের কেউ আশা করেনি।

যে হত্যাকাণ্ড ইরানের নেতৃত্বকে দুর্বল করার কথা ছিল, তা উল্টো প্রতিরোধের আখ্যানকে আরও শক্তিশালী করে দিয়েছে। আমেরিকার শক্তি প্রদর্শনের জন্য শুরু হওয়া সামরিক অভিযান তার দুর্বলতাগুলোকে সামনে এনেছে। আর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শুরু হওয়া ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ এখন এমন একটি সংঘাতে পরিণত হয়েছে, যা থেকে যত দ্রুত সম্ভব বেরিয়ে আসতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র।

Leave a comment
scroll to top