ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দীর্ঘ নয় বছর পরে ইসরায়েল সফর এক নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। একদিকে যখন ভারতের বিরোধী দলগুলোর একাংশ, বিশেষ করে দেশটির কমিউনিস্ট পার্টিগুলো, মোদী সরকারের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ও ইসরায়েলের সাথে অতিরিক্ত সখ্যতাকে সমালোচনা করেছে ও ভারতের ফিলিস্তিনের সমর্থনে থাকার ঐতিহ্য কে নষ্ট করার অভিযোগ করেছে, তখন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই সফর নিয়ে কিছু ভয়াবহ অভিযোগও সামনে এসেছে।
মোদীর ইসরায়েল সফর
এই সফরটি মোদীর দ্বিতীয় ইসরায়েল সফর। একজন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীরও। এর আগে উনি ২০১৭ সালে যখন প্রথম ইসরায়েল সফরে যান তখনও সেটি নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল। সেই বিতর্ক সম্প্রতি আবার আলোচনায় এসেছিল কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায় বিভাগের প্রকাশ করা শিশুদের যৌন নিপীড়ণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়া, প্রয়াত জেফ্রি এপস্টেইন-র ফাইলে এই সফরের উল্লেখ পাওয়া যায়।
এপস্টেইন ইমেলটিতে লিখেছিলেন যে মোদী ইসরায়েলে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতির নির্দেশ মতন “নাচ গান করেছেন” সে দেশের নেতৃত্ব কে খুশি করতে। ঘটনা চক্রে তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতিটি বর্তমানেও সেই পদেই রয়েছেন।
মোদী ইসরায়েল সফরে যাবেন এই ব্যাপারটা দীর্ঘদিন ধরে ঠিক হয়ে থাকলেও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রক কোনো তারিখ ঘোষণা করেনি। যদিও মোদীর শাসক ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সূত্র থেকে ভারতীয় সংবাদ সংস্থাগুলো জেনে যায় যে প্রধানমন্ত্রী ইসরায়েল সফরে যাবেন, যাত্রার তারিখ কিন্তু নয়াদিল্লী ঘোষণা দেওয়ার আগেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা করেন।
সোমবার, ২৩শে ফেব্রুয়ারি, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের এই সফরের দিনক্ষণ জানান।
তিনি ঘোষণা করার পরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রক ২৪শে ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করে যে প্রধানমন্ত্রী ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি দুই দিনের সফরে ইসরায়েল যাবেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পরে একদিনের নোটিসে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রক প্রধানমন্ত্রীর যাত্রার বিবরণ দিচ্ছে দেখে অনেক সমালোচকেরা ভ্রু কুঁচকেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রক আরও জানায় যে “এই সফরের সময়, প্রধানমন্ত্রী ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী, মাননীয় মিঃ বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সাথে দেখা করবেন। দুই নেতা ভারত-ইসরায়েল কৌশলগত অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি পর্যালোচনা করবেন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা, কৃষি, জল ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও অর্থনীতি এবং জনগণের সাথে জনগণের বিনিময় সহ সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আলোচনা করবেন। নেতারা পারস্পরিক স্বার্থের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিষয়গুলিতেও দৃষ্টিভঙ্গি বিনিময় করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।”
“এই সফর দুই দেশের মধ্যে গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত অংশীদারিত্বকে পুনর্নিশ্চিত করবে এবং দুটি স্থিতিশীল গণতন্ত্রের মধ্যে একটি শক্তিশালী অংশীদারিত্বের জন্য তাদের ভাগ করা দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনের লক্ষ্যে সাধারণ চ্যালেঞ্জগুলি পর্যালোচনা করার পাশাপাশি প্রচেষ্টাগুলিকে পুনর্বিন্যাস করার সুযোগ প্রদান করবে,” মন্ত্রকটি তার বিবৃতিতে জানায়।
প্রধানমন্ত্রী নিজেও তাঁর সামাজিক মাধ্যমে করা পোস্টে ভারত ও ইসরায়েলের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার উপর জোর দিয়েছেন।
“আমাদের দেশগুলির মধ্যে একটি শক্তিশালী এবং বহুমুখী কৌশলগত অংশীদারিত্ব রয়েছে। গত কয়েক বছরে সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে,” তিনি লিখেছেন।
তাঁর শাসনকালে মোদী ভারতের সাথে ইসরায়েলের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারিত্বে পরিণত করেননি, দুই শক্তিকে একই অক্ষে নিয়ে এসেছেন।
“আমি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সাথে আলোচনা করব, যেখানে আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদার করার উপায় নিয়ে আলোচনা করব। আমি ইসরায়েলের রাষ্ট্রপতি আইজ্যাক হার্জোগের সাথেও দেখা করব,” মোদী আরও লিখেছেন।
Had an excellent meeting with Prime Minister Netanyahu. Expressed gratitude to him for the warm welcome earlier in the day. It is a delight to be back in Israel after 9 years. We discussed a wide range of subjects aimed at boosting bilateral ties. Sectors such as technology,… pic.twitter.com/uh1cyL411c
— Narendra Modi (@narendramodi) February 25, 2026
আর এখানে দ্রষ্টব্য ভারত ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংগঠন (এসসিও) সদস্য হয়েও অন্যদের মতন ইসরায়েলের গাজায় চালানো গণহত্যার বিরোধিতা করেনি। তিনি বরং অক্টোবর ২০২৩ সালে ইসরায়েলের গাজা হামলা শুরু হওয়ার পরেই সরাসরি নেতানিয়াহুকে সমর্থন জানান। পরে যদিও তিনি ভারতের চিরাচরিত দুই-রাষ্ট্র সমাধানের মাধ্যমে পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি স্থাপনের কথা বলেন, গাজা নিয়ে উচ্চবাচ্য করেননি। মোদী নিজে দুই বছরে মাত্র দুইবার গাজা শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন।
নয়াদিল্লী গাজায় দুই বছরে মাত্র দুইবার ত্রাণ পাঠিয়েছিল বলে ইস্ট পোস্টকে জানিয়েছে রামাল্লা স্থিত ভারতের প্রতিনিধি দফতর।
যদিও ২০২৫ সালের অগাস্ট মাসে এসসিও শীর্ষ সম্মেলনে তিনি অংশগ্রহণ করতে চীনে যান ও সেখানকার ঘোষণাপত্রে, যাতে গাজা গণহত্যা ও ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের উপর হামলার নিন্দা করা হয়েছিল, সাক্ষর করেন, তাঁর চাপেই রাশিয়া ও চীন গাজার প্রসঙ্গে “গণহত্যা” শব্দটি ব্যবহার করেনি।
আর এই দুই বছরে ভারতের সাথে যৌথ উদ্যোগে, বিশেষ করে মোদীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ও নানা কেলেঙ্কারির কারণে কুখ্যাত হওয়া গৌতম আদানির সংস্থার সাথে, ইসরায়েলের যুদ্ধাস্ত্র সংস্থাগুলো ড্রোন ও অন্যান্য মারণাস্ত্র উৎপাদন করে এবং সেগুলো গাজা গণহত্যায় ব্যবহারের জন্যে রপ্তানিও করে।
যদিও ভারত সংযুক্ত রাষ্ট্রে কয়েকটি বিষয়ে, যেমন পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের আগ্রাসন ও গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর বিষয়ে, ইসরায়েলের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে, গাজা গণহত্যা নিয়ে নয়াদিল্লী সরাসরি তেল আবিবের সাথে দাঁড়িয়েছে।
আর এর পিছনে রয়েছে অর্থনৈতিক ও সামরিক কিছু অভিলাষা। যা মোদী পৌঁছানোর আগেই নেতানিয়াহু ফাঁস করে দিয়েছেন।
ইসরায়েলের অক্ষে ভারতের প্রবেশ, ইরানের সাথে বিচ্ছেদ
নেতানিয়াহু সোমবার মোদীর ইসরায়েল সফরের কথা জানানোর সময় জানান যে এই সফরের সময়ে নয়াদিল্লী তেল আবিবের সাথে একটি ছয় দেশীয় অক্ষে যোগ দেবে। এই অক্ষ সম্পর্কে বলতে গিয়ে নেতানিয়াহু বলেছেন যে অঞ্চলে “শিয়া চরমপন্থী অক্ষ”—যা ইরানের নেতৃত্বাধীন জায়নবাদ-বিরোধী প্রতিরোধের অক্ষ বলে পরিচিত—বাদেও একটি “সুন্নি চরমপন্থী অক্ষ” তৈরি হচ্ছে। তিনি জানিয়েছেন ইসরায়েলের নেতৃত্বে এই ছয় দেশীয় ষড়ভুজ অক্ষ, যাতে ভারত, গ্রিস, সাইপ্রাস বাদেও কিছু আরব ও আফ্রিকান রাষ্ট্র থাকবে, এই সুন্নি ও শিয়া অক্ষগুলোর মোকাবিলা করবে।
বর্তমানে ইরানের সাথে ইসরায়েলের বৈরিতা এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ইসরায়েলের চাপে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প পশ্চিম এশিয়ায় ২০০৩ সালের ইরাক আগ্রাসনের পরে প্রথমবার ব্যাপক পরিমানে সৈন্য, যুদ্ধ জাহাজ ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছে যে ইরান কে পশ্চিমাদের ঘনিষ্ঠ ওমানের মধ্যস্থতায় একটি লম্বা দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় আটকে রেখে ট্রাম্প নেতানিয়াহু কে তেহরানের উপর আক্রমণের পথ খুলে দিচ্ছেন। আবার ইরান যাতে পাল্টা হামলা না করতে পারে তাই মার্কিন নৌবাহিনীর সর্ববৃহৎ বিমানবাহী জাহাজ ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড ও পারমাণবিক শক্তি-চালিত ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনকে ভূমধ্যসাগর ও আরব সাগর হয়ে হরমুজ প্রণালীর দিকে নিয়ে আসছে।
এর পিছনে ইরানের অসামরিক পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার একটি বাহানা বলে ভূরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। আসল লক্ষ্য হলো যে কোনো ভাবেই ইরানের বর্তমান শাসকদেরকে উচ্ছেদ করা, যা পশ্চিম এশিয়ায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অক্ষ কে নিরন্তর মদদ করে চলেছে।
তেল আবিব জানে একার শক্তিতে সে ইরানকে হারাতে পারবে না। তাই তার যুক্তরাষ্ট্র কে দরকার। আর যুক্তরাষ্ট্র এই সুযোগে ইরানের তেল ও গ্যাস নিজের দখলে আনতে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাসনে থাকা উচ্ছেদ হওয়া রাজতন্ত্রের স্বঘোষিত রাজকুমার রেজা পাহলাবিকে তেহরানে ক্ষমতায় বসাতে চায়।
এই দুই শক্তির স্বার্থে, ভারত ইরানের সাথে তার ভালো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নষ্ট করে চলেছে, নিজের দীর্ঘকালীন স্বার্থ কে বিপন্ন করে। ভারত ইরানের সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্বের থেকে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের দাবি মতন দূরে সরে এসেছে। এমনকি প্রচুর অর্থ লগ্নি করে তৈরি করা চাবাহার বন্দর থেকেও নিজেকে ভারত গুটিয়ে নিয়েছে।
কিন্তু এই শিয়া অক্ষ কে, যাতে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা, ফিলিস্তিনের নানা প্রতিরোধ সংগঠন থেকে শুরু করে ইরাকের কাতিব হিজবুল্লাহ রয়েছে, উচ্ছেদ করলেই ইসরায়েলের স্বার্থ পূর্ণ হবে না। এর সাথে তার সাথে যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠ নানা দেশের বিরোধ তীব্র হতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে। যার মধ্যে ইসরায়েলের মাথাব্যথার মূল কারণ হতে পারে সৌদি আরব।
সুন্নি অক্ষের উদয়
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আবদ্ধ থাকার পরে এবং কৌশলগত ভাবে ইসরায়েল কে মদদ করার পরে রিয়াদ বর্তমানে একটি নতুন সমীকরণের অংশ হয়েছে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের (এমবিএস) নেতৃত্বে।
গত বছর যখন ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ কাতারে হামলা করে, সৌদি আরব বুঝে যায় যে শুধু ওয়াশিংটনের সখ্যতা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বীমা পলিসি হিসাবে কাজ করবে না। তৎক্ষণাৎ, ইসলামিক দেশগুলোর ও আরব লীগের বিশেষ সভার পরে সৌদি আরব পাকিস্তানের সাথে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি করে। এর ফলে এই দুই দেশের কোনো একটি আক্রান্ত হওয়া মানে অন্যটিও আক্রান্ত হওয়া। এর ফলে যেমন সৌদি আরব মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিকে নিজের পাশে পেয়েছে, তেমনি পাকিস্তান পাচ্ছে অর্থনৈতিক অক্সিজেন ও ভারতের সাথে দ্বন্দ্ব হলে সৌদি আরবের প্রভাব।
এ ছাড়াও, বিগত কয়েক মাসে সুদান যুদ্ধে ও ইয়েমেনে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির ভূমিকা ও আবু ধাবির সাথে তেল আবিবের ঘনিষ্ঠতার ফলে সৌদি ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মধ্যে বিবাদ বেড়ে গেছে।
এ ছাড়াও সৌদি আরব নানা ধরণের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে, যাতে ইসরায়েলের লাভ হতে পারে, যোগ দিচ্ছে না আর না হয় জায়নবাদী শক্তিটিকে এড়িয়ে চুক্তি করছে।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতে অনুষ্ঠিত হওয়া জি-২০ সম্মেলনে ভারত-মধ্য প্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর (আইমেক) তৈরির প্রস্তাব করা হয়। এই করিডোর দিয়ে ভারতে আদানির মালিকানাধীন মুন্দ্রা বন্দর বা মুম্বাই বন্দর দিয়ে পণ্য জাহাজে করে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি যাবে ও সেখান থেকে রেল পথে সৌদি আরব, জর্ডান হয়ে ইসরায়েলের আদানি মালিকানাধীন হাইফা বন্দর থেকে জাহাজে করে ইতালি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করবে। উল্টো দিক থেকেও একই ভাবে পণ্য প্রবাহ চলবে।
ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এই আইমেক প্রকল্পটি নিয়ে প্রচন্ড উৎসাহী, কারণ এটি তারা চীনের বেল্ট রোড উদ্যোগের বিকল্প হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে এবং পণ্যের সাথে এই পথে গ্যাস, ডেটা প্রভৃতি পাঠাতে চাইছে। এরই মধ্যে ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়েছে।
কিন্তু ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা শুরু করার পর থেকে সৌদি আরব এই প্রকল্পের কাজে অংশগ্রহণ করার থেকে পিছিয়ে গেছে। এমবিএস বলেছেন রিয়াদ তখনই এই প্রকল্পে হাত দেবে যখন ইসরায়েল দ্বি-রাষ্ট্র তত্ত্বের ভিত্তিতে স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে মেনে নেবে।
নিজের প্রভাব ব্যবহার করে, বিশেষ করে আঞ্চলিক প্রতিযোগী ইরান কে ঠেকাতে, সৌদি আরব পশ্চিমা বিশ্বের নানা শক্তিকে, যেমন ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইত্যাদিকে, একত্রে এনে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি আদায় করে দিয়েছে। যদিও সেই স্বীকৃতির ফলে যে রাষ্ট্র সৃষ্ট হবে সেটা শর্তসাপেক্ষে, সার্বভৌমত্বহীন ভাবে তৈরি হবে।
এ ছাড়াও সৌদি আরব ও তুরস্ক একত্রে চেষ্টা করেছিল সন্ত্রাসী শক্তিদের ব্যবহার করে সিরিয়ার প্রগতিশীল বাথ সমাজতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করতে। সাবেক আল-কায়দা সন্ত্রাসী আহমদ আল শারা—ওরফে আবু মোহাম্মদ আল জুলানি—যখন বাশার আল আসাদের বাথ সমাজতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে, তখন তুরস্ক আর সৌদি আরব নতুন রাষ্ট্রে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করতে থাকে।
এই সময়ে ইসরায়েল বারবার আক্রমণ করে এই ইসলামী সন্ত্রাসী শক্তির থেকে অতিরিক্ত অঞ্চল দখল করা শুরু করে। সিরিয়া কে বিভক্ত করেই যে ইসরায়েলের স্বার্থ সিদ্ধি হবে সেটা তেল আবিব বারবার জানান দিয়েছে। এতে সৌদি আরব ও তুরস্ক দুই পক্ষই অসন্তুষ্ট হয়েছে।
এর সাথে সাথে মিশরের সরকারও ইসরায়েলের হামলার শিকার হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। এর ফলে এই তিনটি দেশের একটি অক্ষ, যার সাথে সৌদি আরব-পাকিস্তান অক্ষের যোগ রয়েছে, আজ ভূরাজনীতির ক্ষেত্রে ইসরায়েলের কাছে একটি চ্যালেঞ্জ হিসাবে দাঁড়িয়েছে। মিশরের মুসলিম ভ্রাতৃত্ব সংগঠনকেও শিয়া ইরানের হাতে কুক্ষিগত হয়ে যাওয়া ফিলিস্তিনি ও জায়নবাদ-বিরোধী প্রতিরোধ শক্তির সুন্নি বিকল্প খাড়া করতে হচ্ছে। তাদের অনুপ্রেরণায় চলা হামাসও বর্তমানে তেহরানের প্রভাবে আছে। ফলে মুসলিম ভ্রাতৃত্বের সাথে সৌদি-তুরস্কের দূরত্ব কমার সম্ভাবনাও সৃষ্টি হচ্ছে।
সবচেয়ে মুশকিলের ব্যাপার হলো এই অক্ষের সবকটি শক্তিই কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু এবং এই অক্ষকে গোপনে কাতার সমর্থনও করছে।
ফলে ইরানের মতন ইসরায়েলের পক্ষে এই অক্ষের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কে দাঁড় করানো সম্ভব না। ফলে সে এই ষড়ভুজীয় অক্ষ তৈরি করছে বৈরিতার হিসাব করে।
সৌদি আরব-পাকিস্তানের সামরিক চুক্তি ভারতের আশঙ্কার কারণ হওয়ায়, নয়াদিল্লী তড়িঘড়ি সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি করে রিয়াদ কে একটি বার্তা দেয়। তখন থেকেই স্পষ্ট নতুন করে সৃষ্টি হওয়া সৌদি আরব-সংযুক্ত আমিরশাহি দ্বন্দ্বে ভারত ও ইসরায়েল এক সাথে আবুধাবির সাথে দাঁড়াবে। এ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র-সংযুক্ত আরব আমিরশাহি-ভারত-ইসরায়েল (ইউ২-আই২) জোট আগের থেকেই তৈরি ছিল। এই ইউ২-আই২ জোটের ফলে নয়াদিল্লীর সাথে আবুধাবির সামরিক জোট হওয়া অনেক সহজ হয়ে গেছে।
ফলে ভারত এই ষড়ভুজীয় অক্ষে প্রবেশ করছে। যদিও এই অক্ষের আরব ও আফ্রিকান দেশগুলোর নাম নেতানিয়াহু বলেননি, বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এই অক্ষে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সাথে আফ্রিকার মরোক্কো সহ কিছু দেশ যোগ দিতে পারে। অন্যদিকে তুরস্কের সাথে বিবাদ কে ব্যবহার করে ইসরায়েল খুব সহজেই গ্রিস ও সাইপ্রাসকে এই অক্ষে টেনে আনতে সক্ষম হয়েছে।
মোদীর ইসরায়েল সফর কী বার্তা দিচ্ছে?
ইসরায়েলি সংসদ, নেসেটে ভাষণ দেওয়া নিয়ে মোদী বলেছেন, “এটি আমাদের সংযুক্তকারী শক্তিশালী সংসদীয় এবং গণতান্ত্রিক বন্ধনের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।”
ভারতের সংসদে যখন বিরোধী দলের নেতাকে বলতে বাঁধা দেওয়া হচ্ছে, বিরোধীরা স্পিকারের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলছেন, এবং যখন আন্তর্জাতিক গণতন্ত্রের মানদন্ডে ভারত ক্রমাগত নিচে নামছে, তখন একটি দখলদারি রাষ্ট্রের সংসদীয় গণতন্ত্র নিয়ে মোদীর বক্তব্য ভারতের রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করছে।
মোদীর ইসরায়েল সফরের মধ্যে দিয়ে ভারত বার্তা দিতে চাইছে যে সে তার বিদেশ নীতিকে বিংশ শতাব্দীর নিরিখে নয়, একবিংশ শতাব্দীর সুবিধাবাদের ভিত্তিতে নির্ণয় করবে। ফলে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার কথা বিদেশনীতিতে লেখা থাকলেও, ভারত সেটিকে উপেক্ষা করে ইসরায়েলের সাথে দাঁড়াবে। কারণ এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে চীনকে টেক্কা দেওয়ার ক্ষমতা যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি একই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর বিজেপি ঘনিষ্ঠ বৃহৎ কর্পোরেট সংস্থাগুলো, যেমন আদানি গোষ্ঠী, লাভবান হবে। এ ছাড়াও, ইসরায়েলের বর্ণ বিদ্বেষী, ইসলাম বিদ্বেষী ও চরম মৌলবাদী শাসন ব্যবস্থার থেকে শিক্ষা নিয়ে ভারতের রাষ্ট্র কাঠামোকে খোলনলচে বদলে ফেলার মোদী সরকারের প্রকল্পও এই সফরের ফলে লাভবান হবে।
তবে মোদীর এই ইসরায়েল সফর থেকে সত্যিই ভারতের জনগণ কী লাভ হবে সেই প্রশ্ন উঠতে থাকবে।
পশ্চিম এশিয়ার জ্বালানি বাজার যুক্তরাষ্ট্রের ইরান আগ্রাসনের ফলে অস্থিতিশীল হবে, ঊর্ধ্বগামী হবে। এর ফলে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপে রাশিয়ার থেকে তেল কেনা বন্ধ করে দেওয়া মোদী সরকার ভারতের বিদেশী মুদ্রা ভাণ্ডার শেষ করবে বেশি দামে তেল কিনে।
এছাড়াও লক্ষ লক্ষ ভারতীয় পরিযায়ী শ্রমিক উপসাগরীয় অঞ্চলে বাস করে। ইরানের সাথে একটি বৃহত্তর যুদ্ধ বাণিজ্য এবং রেমিট্যান্স দ্রুত ব্যাহত করবে।
মোদীর ইসরায়েল সফর এইভাবে জুয়া খেলার মতন ধরে নেয় যে একমেরু বিশ্বে ক্ষমতার নৈকট্য ভারতকে কোনো করুণ পরিণতি থেকে রক্ষা করবে। বিজেপিকে চিরকাল ক্ষমতায় রাখবে। এর সাথে মোদী সরকার এটাও ধরে নেয় যে কূটনীতির ক্ষেত্রে নৈতিক অস্পষ্টতার শাস্তি খুব কম।
কিন্তু ইতিহাস খুব কমই এই ধরনের নিশ্চয়তা দেয়।



