Close

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি: ট্রাম্পের শর্তে মোদীর আত্মসমর্পণ

যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের পণ্যের উপর শুল্ক ৩.৮৯% থেকে ১৮%-এ বৃদ্ধি, অন্যদিকে ভারতকে ৫০,০০০ কোটি ডলার মূল্যের আমদানির প্রতিশ্রুতি দিতে এবং রুশ তেল ত্যাগ করতে বাধ্য করা, এগুলো কি সার্বভৌমত্ব কেড়ে নেওয়া নয়?

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে মোদীর দাবি ও বাস্তবতার মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক কি কূটনৈতিক জয়, নাকি জাতীয় স্বার্থের বিসর্জন?

US President Donald Trump with Indian Prime Minister Narendra Modi in Washington, February 2025. Photo credit: PIB

ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতেই ওয়াশিংটন থেকে আসা দুটি খবর প্রায় একই সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে এমন এক বিপজ্জনক রাজনৈতিক কোণঠাসায় ফেলে দিয়েছে, যেখান থেকে তাঁর বেরিয়ে আসার পথ ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। একদিকে শিশুদের যৌন নির্যাতনের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হওয়া জেফ্রি এপস্টাইন কেলেঙ্কারির নথিতে তাঁর নাম, অন্যদিকে তড়িঘড়ি করে ঘোষিত ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি—যাকে নয়াদিল্লি ঐতিহাসিক জয় বলে প্রচার করলেও তথ্য বলছে ঠিক উল্টো কথা। বাস্তবতা হলো, এ বাণিজ্য চুক্তি ভারতীয় অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদী বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি করেছে।

ভারতে বসন্ত ঋতুর শুরুতেই মোদী যেন দুই আগুনের মাঝখানে আটকা পড়েন। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির একতরফা ঘোষণা দেন। ঠিক একই সময়ে, আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে প্রকাশিত এপস্টাইন ই-মেইলে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নাম উঠে আসে এক কলঙ্কজনক আন্তর্জাতিক বিতর্কে। এই দুই ঘটনা একযোগে মোদীর সযত্নে গড়া ‘দৃঢ় জাতীয়তাবাদী নেতা’-র ভাবমূর্তিকে ধুলিসাৎ করে দিয়েছে।

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি সম্বন্ধে যে সত্য ভারতীয় মিডিয়া গোপন করছে

ভারতের মূলধারার গণমাধ্যম—যাদের অধিকাংশই মোদী সরকারের প্রচার-যন্ত্রে পরিণত হয়েছে—ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তিকে যুগান্তকারী কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে জাতীয়তাবাদী উন্মাদনায় প্রচার করছে। কিন্তু পর্দার আড়ালের বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। গত কয়েক মাস ধরে মোদী সরকার মরিয়া হয়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে রাজি করানোর চেষ্টা করছিল, যাতে গতবছর ভারতীয় পণ্যের ওপর আরোপিত শাস্তিমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়। গত বছরের আগস্টে ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর তাঁর প্রাথমিক ভাবে চাপানো ২৫% শুল্কের ওপর আরও ২৫% শাস্তিমুলক শুল্ক বসিয়ে মোদীকে কোণঠাসা করে ফেলেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, ছাড়মূল্যে রুশ তেল কিনে ভারত পরোক্ষভাবে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধকে অর্থায়ন করছে।

দীর্ঘ কূটনৈতিক তৎপরতার পর বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল একটি ‘সমঝোতায়’ পৌঁছান—যা বাস্তবে একতরফা আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কিছু নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি যেখানে প্রকাশ্যে আলোচনা হয়েছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে এই চুক্তির শর্তাবলি নিয়ে নয়াদিল্লি ভারতীয় জনগণকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখেছে। ভারতীয়রা চুক্তির খবর জানতে পারে ট্রাম্পের নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্ট থেকে—যা নির্দ্বিধায় প্রমাণ করে, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে ওয়াশিংটনের হাতে রয়েছে।

ট্রাম্পের একতরফা ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি ঘোষণা কী ইঙ্গিত করে?

সাধারণত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি যৌথ সংবাদ সম্মেলন বা আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ঘোষণা করা হয়—যা সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতীক। কিন্তু এবার তা হয়নি। ট্রাম্প তার চেনা আধিপত্যবাদী ভঙ্গিতেই অনলাইনে চুক্তির ঘোষণা দেন, যেন ভারত তার কোনো অধীনস্থ রাষ্ট্র।

তিনি লেখেন, “প্রধানমন্ত্রী মোদীর প্রতি বন্ধুত্ব ও সম্মান দেখিয়ে, এবং তাঁর অনুরোধে (বোল্ড ইস্টপোষ্ট), আমরা অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে একটি বাণিজ্য চুক্তিতে সম্মত হয়েছি। এতে যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক শুল্ক ২৫% থেকে কমিয়ে ১৮% করবে। ভারতও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সব ধরনের শুল্ক ও অশুল্ক বাধা শূন্যে নামাতে এগোবে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী ‘বাই আমেরিকান’-এ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছেন—জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃষিপণ্য, কয়লা ও আরও বহু পণ্যে ৫০০ বিলিয়ন (৫০,০০০ কোটি) ডলারের বেশি কেনাকাটাসহ।”

লক্ষণীয়, ট্রাম্পের ভাষায় এটি মোদীর ‘অনুরোধ‘—যা ভারতের দুর্বল অবস্থানকে প্রকাশ্যে স্বীকার করে নেওয়ার সামিল।

আর এই দুর্বলতা কি এখন প্রকট হয়েছে?

গত বছরের মে মাসে অপারেশন সিঁদুর নামক ভারতের পাকিস্তানের উপর করা সামরিক হামলার ফলে দুই পারমাণবিক শক্তির মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়। সেটা থামাতে নাকি ট্রাম্প মধ্যস্থতা করেন ও তার ফলে ভারত আর পাকিস্তান হঠাৎ যুদ্ধ বিরতি করতে রাজি হয় বলে তিনি দাবি করেন।

পাকিস্তান ট্রাম্পের দাবিতে সায় দেয়। পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ নিজের দেশের পণ্যের উপর কম শুল্ক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভাণ্ডার (আইএমএফ) থেকে ঋণ পাওয়ার তাগিদে ট্রাম্পের দাবিকে সরাসরি সমর্থন দেন। এতে ভারত মুশকিলে পড়ে। ভারতের বিরোধীরা দাবি করে প্রধানমন্ত্রী যেন এই বিষয়ে অস্পষ্টতা মিটিয়ে দেন। মোদী সংসদে বলেন যে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে অস্ত্রবিরতি দ্বিপাক্ষিক ভাবে করা হয়েছে এবং এর মধ্যে অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষ হস্তক্ষেপ করেনি। কিন্তু বিরোধীদের দাবি মত মোদী ট্রাম্প কে মিথ্যাবাদী বলার সাহস দেখাননি সংসদে।

আর তারপর ট্রাম্প যখন রুশ তেল কেনার জন্যে ভারতের পণ্যের উপর ২৫% অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক চাপান, তখনও মোদী ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পাননি। 

যদিও রাশিয়ার সাহায্যে আগস্ট মাসের শেষে চীনের তিয়ানজিন শহরে অনুষ্ঠিত সাংহাই সহযোগিতা সংগঠনের (এসসিও) বৈঠকে তিনি বহু বছরের পর সশরীরে যোগ দেন ও চীন-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে বরফ গলানোর কাজ করেন, এবং সেখানেই তিনি সেই তিয়ানজিন ঘোষণা সাক্ষর করেন যা গাজায় ইজরায়েলি হামলার ও ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ হামলার বিরোধিতা করে, মোদী কিন্তু দৃঢ় ভাবে এই বহুমেরুর বিশ্বের সংকল্পে যোগ দেননি। বরং তিনি এই মঞ্চের চিত্রকে ব্যবহার করেছেন সুকৌশলে ট্রাম্পের সাথে দরকষাকষি করার জন্যে। কিন্তু তাতেও ফল হয়নি। ভারত কে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সামনে ঝুঁকতে হয়, নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিতে হয়, কিন্তু একই সময় জনগণকে দেখাতে হয় যে এই চুক্তি ভারতের পক্ষে লাভজনক। 

এক্সে (সাবেক টুইটার) উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তিনি লেখেন, “মেড ইন ইন্ডিয়া পণ্যের ওপর শুল্ক ১৮%-এ নামছে—এতে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। এই ঘোষণার জন্য ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ধন্যবাদ।”

অন্তর্বর্তী চুক্তি নিয়েও মোদী উচ্ছাস প্রকাশ করেন এমন এক সময় যখন তাঁর বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এএনআই কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে তিনি এই চুক্তির বিষয়ে বিশদ জানেন না এবং বলটি সযত্নে গোয়ালের কোর্টে ঠেলে দেন। 

সরকার ও ক্ষমতাসীন কট্টর ডানপন্থী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) তাৎক্ষণিকভাবে এই ঘোষণাকে ঐতিহাসিক কূটনৈতিক জয় হিসেবে প্রচার শুরু করে। গোয়াল তবুও পর্দার আড়ালেই থেকে যান, আর মোদী সমর্থকদের কাছ থেকে অন্ধ প্রশংসায় ভাসেন। কিন্তু এই উচ্ছাসের আবহে পরিসংখ্যান কী বলছে?

সংখ্যার নিষ্ঠুর সত্য: জয় নয়, পরাজয়

বিজেপি নেতারা ও সরকারি কূটনীতিকেরা যতই দাবি করুন, শুল্ক ৫০% থেকে ১৮%-এ নামানো হয়েছে—যা নাকি বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের চেয়েও কম—ঐতিহাসিক তথ্য এই প্রচারণার মুখোশ খুলে দেয়।

বিশ্বব্যাংকের ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী, কোভিড-পরবর্তী প্রথম পূর্ণ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া ৫,৬০০-এর বেশি ভারতীয় পণ্যের ওপর গড় শুল্ক ছিল মাত্র ৩.৮৯%। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির নতুন ব্যবস্থায় সেই গড় শুল্ক লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ১৮%-এ—আগের তুলনায় প্রায় সাড়ে চার গুণেরও বেশি। যেটিকে দিল্লি ঐতিহাসিক বিজয় হিসেবে প্রচার করছে, বাস্তবে তা ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য এক ভয়াবহ পশ্চাদপসরণ।

আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো যে ২০২২ সালে ৫৪ ধরনের ভারতীয় পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কমুক্ত প্রবেশ করত—প্রাণিজ ও কৃষিপণ্য থেকে শুরু করে কাঁচামাল, খনিজ, যন্ত্রপাতি ও ওষুধ পর্যন্ত। নতুন ব্যবস্থায় এসব পণ্যের প্রতিটিই অনেক বেশি মূল্য-প্রাচীরের মুখে পড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে চাহিদা ধ্বংস করবে এবং ভারতীয় উৎপাদকদের দেউলিয়া করবে।

সবচেয়ে ভয়াবহ সত্য হলো সেই সময় মাত্র তিনটি ভারতীয় পণ্যগোষ্ঠীর ওপর ১৮% বা তার বেশি শুল্ক ছিল। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির কল্যাণে এখন সেই সংখ্যা বেড়ে ৫,৬০০ ছাড়িয়ে যাবে। রপ্তানিকারকদের জন্য সরকারের প্রতিশ্রুত স্বস্তি তাই নির্লজ্জ মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছু নয় বলে সমালোচকেরা এবং বিরোধীরা দাবি করছেন। 

আমদানির বিপর্যয়কর প্রতিশ্রুতি

মোদী সরকার শুল্ক হ্রাসের গল্প বলে ভারতীয় জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু আসল বিপদ লুকিয়ে আছে আমদানির শর্তগুলোতে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত বিতর্কিত চুক্তির মতোই, ওয়াশিংটনের সঙ্গে এই চুক্তি ভারতীয় বাজারকে মার্কিন পণ্যের জন্য অবাধে উন্মুক্ত করে দিচ্ছে—যা দেশীয় শিল্পকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।

ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ভারত ৫০,০০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের মার্কিন পণ্য—জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃষিপণ্য ও কয়লা—কিনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে এবং সব শুল্ক ও অশুল্ক বাধা সম্পূর্ণভাবে তুলে নেবে। ভারত সরকার এই মর্মান্তিক আত্মসমর্পণ বিষয়ে সম্পূর্ণ নীরব। সেই নীরবতাই স্বীকারোক্তির সামিল।

আর এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভারতের কৃষি ক্ষেত্র, যে খানে এতদিন চড়া শুল্কের কারণে বিদেশী প্রতিযোগিতা ছিল না। ফলে ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর অবধি দিল্লী ঘেরাও করা আন্দোলনকারী কৃষকদের নেতৃত্বকারী সংগঠন সংযুক্ত কিষান মোর্চা এই চুক্তির বিরোধিতা করেছে এবং গোয়ালের অপসারণ দাবি করেছে।

সংখ্যা মিথ্যা বলে না। ২০২২ সালে ভারতে প্রবেশকারী মার্কিন পণ্যের ওপর গড় শুল্ক ছিল ১৩.৮৬%। শীর্ষ পাঁচটি পণ্যের ক্ষেত্রে তা ১০০% থেকে ১৫০% পর্যন্ত ছিল—যা দেশীয় শিল্প রক্ষার জন্য অত্যাবশ্যক ছিল। মাত্র ১৩ ধরনের মার্কিন পণ্য শুল্কমুক্ত ছিল। 

২০২৩ সালে ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৭,০০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করলেও ৫,০১০ কোটি ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বজায় রাখতে পেরেছিল।

ট্রাম্পের বানিয়ে দেওয়া চুক্তি বাস্তবায়ন হলে, সেই উদ্বৃত্ত সম্পূর্ণ বিলীন হবে। ভারতকে প্রায় সাত গুণ বেশি পণ্য আমদানি করতে বাধ্য করা হবে—ডলার প্রবাহিত হবে বাইরে, রুপির ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি হবে, মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে।

এতে ভারতীয় অর্থনীতি কীভাবে লাভবান হবে, তা কেউ ব্যাখ্যা করতে পারছে না। কারণ এতে লাভের কিছু নেই—শুধু ক্ষতি আর ক্ষতি।

রুশ তেল ত্যাগ: কার স্বার্থে?

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো রুশ তেল আমদানি বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ভারত রুশ তেল কেনা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। যদি তা সত্যি হয়, তবে এটি ভারতের শক্তি নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে আত্মঘাতী নীতিগত আত্মসমর্পণ।

ইউক্রেন যুদ্ধের আগে ভারতের তেল আমদানির মাত্র ০.২% আসত রাশিয়া থেকে। ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ সালে সস্তায় রুশ তেল কেনার সুযোগ কাজে লাগিয়ে তা বেড়ে দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছায়—যা ভারতীয় কোষাগারে কোটি কোটি ডলার সাশ্রয় করে। রুশ তেল ভারতের সামগ্রিক জ্বালানি তেল আমদানির এক-তৃতীয়াংশ দখল করে ২০২৩ সাল থেকে। 

কিন্তু ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের পর সেই আমদানি কমতে শুরু করে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তা নেমে আসে ১৩ লাখ ব্যারেলের নিচে, আর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে গড়ে ছিল ১১ লাখ ব্যারেল। ফেব্রুয়ারির শেষে তা ৮ লাখের নিচে নামবে বলে অনুমান।

কিন্তু প্রশ্ন হলো: সস্তা রুশ তেলের সুফল কি সাধারণ ভারতীয় ভোক্তারা পেয়েছিল? উত্তর: না। লাভ করেছে শুধুমাত্র তেল বিপণনকারী সংস্থাগুলো—যাদের বৃহৎ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি মোদী সরকারের ঘনিষ্ঠ এক ব্যবসায়িক মিত্রের বলে অভিযোগ।

এখন ওয়াশিংটনের চাপে রুশ তেল ত্যাগ করলে ভারতকে দামি মার্কিন ও মধ্যপ্রাচ্যের তেল কিনতে বাধ্য করা হবে—যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের পকেটেই আঘাত করবে।

এপস্টাইনের ছায়া: কূটনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্ন

বাণিজ্য ও জ্বালানির বাইরেও মোদীর রাজনৈতিক ক্ষতি ক্রমবর্ধমান। বিরোধী দলগুলো এপস্টাইনের ই-মেইলে মোদীর নাম উঠে আসাকে তীব্র রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ২০১৭ সালের এক ই-মেইলে শিশু-যৌন নির্যাতনকারী এপস্টাইন লিখেছিলেন, প্রথমবার দখলীকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সফরের সময় মোদী তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্দেশ মেনে “ইসরায়েলকে খুশি করেছিলেন”।

এই ই-মেইল নতুন করে প্রকাশ্যে আসে ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন ট্রাম্প ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা দেন। এটি কি কাকতালীয়? নাকি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ? ফলে বিরোধী নেতারা এক জ্বলন্ত প্রশ্ন করছেন—ওয়াশিংটনকে খুশি করতে গিয়ে মোদী ঠিক কতটা কূটনৈতিক স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়েছেন?

আসাম, কেরালা, তামিলনাড়ু ও পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নগুলোর রাজনৈতিক মূল্য আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। ওয়াশিংটনের হাতে যেখানে সমস্ত নিয়ন্ত্রণ, সেই চুক্তিকে জাতীয় জয় হিসেবে রক্ষা করা মোদীর দলের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠবে।

Leave a comment
scroll to top